১৫ লাখে চার্জশীট থেকে অব্যাহতি!

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় দুই স্কুল ছাত্রকে হত্যার ঘটনায় ২৪ জনকে আসামী করে আদালতে চার্জশীট দেয়া হলেও ৮ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী ও নিহত জিসানের বাবা বন্দর প্রেস ক্লাবের সাবেক সেক্রেটারী কাজিমউদ্দিন। ক্ষোভ প্রকাশের এক পর্যায়ে তিনি ডিবি পুলিশের এস আই হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে মোটা অংকের টাকা নিয়ে চার্জশীট থেকে আসামীদের নাম বাদ দেয়ার অভিযোগ তোলেন। সেই সাথে তার কাছ থেকেও টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন। এর পাশাপাশি ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করার হুশিয়ারিও দেন।

১৪ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার বিকেলে চার্জশীট দেয়ার ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মামলার বাদী কাজিমউদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

চার্জশীটের ব্যাপারে নিহত জিসানের বাবা কাজিমউদ্দিন বলেন, এই মামলা ডিবিতে আসার পর দারোগা হাসানুজ্জামান সে সঠিকভাবে মামলার তদন্ত করেনি। প্রায় দেখতাম আসামীর লোকজনের সাথে তার যোগাযোগ। তিনি আমার কাছ থেকে নানান ধরণের খরচ বাবদ টাকা নিতো। এ পর্যন্ত তিনি আমার কাছ থেকে প্রায় ৭০ হাজার টাকা নিয়েছে। মোক্তার হোসেনকে যেদিন রিমান্ডে এনেছিল সেদিন তিনি আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। মুছা নামে এক আসামী গ্রেফতার করেছে ওই দিনও তিনি আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। আমার বন্দরের বাড়িতে গিয়ে তিনি ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। যতবার তিনি গাড়ি ও কনস্টেবল নিয়ে যেত ততবার তেল খরচ সহ নানা খরচের অজুহাত দেখাতো; যেকারণে আমি টাকা না দিয়ে পারতামনা। আমি বিপদে পড়ে হলেও তাকে ৫ হাজার করে টাকা দিয়েছি। তিনি যতবার বাগবাড়িতে গিয়েছে আমি ৫ হাজার করে টাকা দিয়েছি। আমি একদিন প্রশ্ন করেছি সরকার তো তেল সহ যাবতীয় খরচ বহন করে। তিনি অস্বীকার করে বলে, ‘সরকার কিসের খরচ বহন করে। সরকার তো রীতিমত আমাকে চেয়ার টেবিলও দেয়না। দেখেন না নরমাল একটা কাঠের চেয়ারে বসে কাজ করি’। এ কথা বলে সে আমার কাছ থেকে একটা চেয়ারও নিয়েছে। চেয়ার নেয়ার পরে চার্জশীট দেয়ার আগে সে আমার কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা দাবি করেছে। আমি তার চাহিদা মত টাকা দিতে পারি নাই। অন্যদিকে তিনি আসামীদের লোকজনদের সাথে যোগাযোগ করছে। চার্জশীট থেকে আসামীদের নাম বাদ দেয়ার জন্য তাদের আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে তিনি প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা নিয়েছে। এই ঘুষ নিয়ে তিনি চার্জশীট থেকে আসামীদের নাম বাদ দিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এস আই হাসানুজ্জামান এর সাথে একটু কথা বলতে গেলে সে ক্ষেপে যেত খারাপ ব্যবহার করতো। এই ঘটনায় আমি ওসি আলমগীরের কাছে বিচারও দিয়েছি। তিনি আমার মনোনিত সাক্ষী না নিয়ে সাক্ষী ঘুরায়। তিনি ৩৮ জন ভুয়া সাক্ষী নিয়েছে, কোন সাক্ষী দেয় নাই আমার কাছে প্রমাণ আছে। এছাড়া এই মামলার আসামীদের আত্মীয়স্বজনদের তিনি সাক্ষী বাড়িয়েছে। সেখানেও মোটা অংকের টাকার লেনদেন হয়েছে শুনতে পেয়েছি।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় আমি ডিবি পুলিশের দায়িত্বে থাকা এএসপি জাহিদুল ইসলামের কাছে আমি বিচার দিয়েছি। আমি হিসাব দিতে গিয়ে ছেলের শোকে অনেক টাকা হিসাব ভুলে গেছি। যাইহোক তিনি সর্বশেষ হিসেব করে ৪৫ হাজার টাকা ও চেয়ার ফিরত দিতে বলেছেন। উনি আমাকে পরের দিন টাকা না দিয়ে ওই যে আওয়ামীলীগ নেতা হুমায়ুন কবির মৃধার মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করেছে নাম কাটাইছে। তার কাছে চেয়ার দিয়ে এসেছে। ৪ দিন পূর্বে ফোন করে হুমায়ুন কবির মৃধা আমাকে চেয়ার নিয়ে যেতে বলে। আমি তাকে বলেছি, চেয়ার নিয়েছে ডিবির এস আই হাসানুজ্জামান। তার যদি চেয়ার ফেরত দিতে হয় সে আমার বাড়িতে চেয়ার দিয়ে যাবে। আমি আপনার কাছ থেকে নিব না। তিনি আরো বললো, ‘দারোগা আমার কাছ থেকে বিকাশের নম্বর চেয়েছে টাকা ফেরত দেয়ার জন্য। তিনি আমার কাছ থেকে যে টাকা নিয়েছে সেই টাকা।’ আমি তাকে বলেছি, ‘হাসানুজ্জামান আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে ঘুষ নিয়েছে। সে আমার কাছে টাকা দিবে। আমি আপনার কাছ থেকে টাকা নিবনা। আমি এই দুর্ণীতিবাজ ও ঘুষখোর অফিসারের বিচার চাই। ওনি এই হত্যা নিয়ে বাণিজ্যে মেতে উঠেছে। আমি এই ঘটনায় সাংবাদিক সম্মেলন করবো। আমি তার বিরুদ্ধে মামলা করবো।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ডিবি পুলিশের এস আই হাসানুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ১০ আগস্ট বিকেলে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে বন্দরের ইস্পাহানী ঘাট এলাকার বিকেলে কাজিমউদ্দিনের ছেলে জিসান (১৫) ও নাজিমউদ্দিন খানের ছেলে মিনহাজুল ইসলাম মিহাদ (১৮) নিখোঁজ হয়। রাতেই তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে নিহত জিসানের বাবা বন্দর প্রেস ক্লাবের সাবেক সেক্রেটারী কাজিমউদ্দিন বাদী হয়ে গ্রেপ্তারকৃত ৬ আসামী সহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো ৮ জনকে আসামী করে বন্দর থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলাটি প্রথমে বন্দর থানা তদন্ত শুরু করে। পরে মামলাটি ডিবিতে বদলী করা হয়। ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক ফকির হাসানুজ্জামান তদন্ত করেন। গত ৫ জানুয়ারী তিনি আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন।

এতে ৮ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তারা হলেন মোক্তার হোসেন, আলী আহাম্মদ, কাশেম, কাউসার, আনোয়ার হোসেন, শিপলু, মনির হোসেন, জাকির হোসেন।

মামলায় ২৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারা হলো আলভী, বড় শামীম, ছোট শামীম, শাকিল, সুজন, বাবু ওরফে টিঅ্যান্ডটি বাবু, নাহিদ, দেলোয়ার হোসেন বাবু, রাকিব, রয়েল, জাহান, বাবু, রবিন, সাজ্জাদ, ইমন, জয়, শান্ত, সজীব, রিয়াদ, রনি, রাজন, আবু মুসা, পাপ্পু। তাদের সকলের বাড়ি বন্দর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে। আসামীদের মধ্যে আলভী, দেলোয়ার হোসেন বাবু ও আবু মুসা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেছেন।

চার্জশীটে উল্লেখ করা হয়, ৯ আগস্ট কিছু লোক নৌকার মাঝি সুমনকে মারধর করে। কিন্তু সুমন তাদের চিনতো না। ১০ আগস্ট বন্দরে আকিজ ফ্লাওয়ার মিলের সামনে একটি দোকানে আলভীর সাথে থাকা অন্তর, অনিক, অনাবিল, প্রিন্স ওরফে সানি, শাহাদাত মুন্না, তোহা, আরসিমদের কাছে মাঝি সুমন বিচার দেয়। দুপুর দেড়টায় ইস্পানি বাজার এলাকাতে পুতুল স্টুডিওতে বিচারের সময়ে বড় শামীম, ছোট শামীম, শাকিল, সুজন, হান্নান খান, রনি, রাকিব, নাহিদ টিএন্ডটি বাবু, বাবু, রয়েল, রবিন, জয়, শান্ত, জাহান, পাপ্পু, সজ্জাদ, সজীব, রিয়াদ, আবু মুসা, ইমন, রাজন, দেলোয়ার হোসেন বাবু ছুটে আসে। তখন উভয় গ্রুপের মধ্যে বাকবিতন্ডা ঘটে। এক পর্যায়ে টিঅ্যান্ডটি বাবু নিজেই অকিলকে দুই হাত দিয়ে ঝাপটে ধরে। খবর পেয়ে বড় শামীমের সরদারের ভাগিনা নাহিদা, শাকিল, সুজন, রনি, রকিব, বাবু, রয়েল, পাপ্পু, রবিন, জয়, শান্ত, জাহান, সাজ্জাদ, সজিব, রিয়াদ, আবু মুসা, ইমন, রাজন এসে অকিলকে ধরে ইস্পানী বাজারে নিয়ে যায়। আলী তখন ছাড়ানোর চেষ্টা করলে তাকে কিল ঘুষি মারা হয়। ওই সময়ে অন্তর নিজেই শাকিলের নানা আবদুলকে আরসিমের মোবাইল দিয়ে বিষয়টি জানায়। পরবর্তীতে আবদুল বড় শামীম ও নাহিদের কাছ থেকে অকিলকে ছুটিয়ে নিয়ে আসে। বিকেল ৩টায় অন্তর, অনিক, সানি, নাজমুল, অকিল ও আরসিম আকিজ কোম্পানীর ময়দার গেটের সামনে আসলে শামীম সরদারের ভাগিনা নাহিদ সরদার দলবল নিয়ে তাদের ধাওয়া করে। ওই সময়ে আলভীর ফোন পেয়ে মিহাদ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

বিকাল সাড়ে ৪টায় বড় শামীম ও ছোট শামীম গ্রুপের লোকজন লাঠিসোটা, দা, রড নিয়ে আলভীদের ধাওয়া করে। ভয়ে তারা ইস্পানী ঘাটের দিকে দৌড়ে আসে। সেখানে আলভী, মিহাদ, জিসান, তোহা, শাহাদাত হোসেন মুন্নাকে পেটানো হয়। তারা বাঁচার জন্য ইস্পানী ঘাটের সিড়ি থেকে লাফি দেয়। প্রিন্স, তোহা, মুন্না, জিসান, মিহাদ ঘাটে ভেড়ানো একটি নৌকায় উঠে পালানোর চেষ্টা করলে আসামীরা জিসান ও মিহাদকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ গুমের জন্য শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে যায়।

সূত্রঃ নিউজ নারায়ণগঞ্জ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin