১২ টা ১৯ মিনিটে বাবাকে কেন ফোন দিয়েছিল আনুশকা?

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

ঘটনার দিন ১২ টা ১৯ মিনিটে আনুশকা তার নিজের মোবাইল থেকে আমাকে ফোন করেছিল।ইফতেখার ফারদিন দিহান ও তার বন্ধুরা যখন আমার মেয়েকে নির্যাতন করছিল তখন সে বাঁচার জন্য আমাকে ফোন দিয়েছিল । কিন্তু মিটিং থাকার কারণে আমি ফোনটি রিসভি করতে পারি নাই। এটাই ছিল আমার ভুল। ফোনটি আমি রিসভি করতে পারলে পরিস্থিতি আজ ভিন্ন হতো।

রোববার মেয়ে হারানোর বেদনায় কান্না জর্জরিত কন্ঠে  কথাগুলো বলেন আনুশকার বাবা।  

গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কলবাগানে মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী আনুশকা নূর আমিনাকে ধর্ষণ করে দিহান। ধর্ষণের পরে গোপনাঙ্গে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আনুশকার মৃত্যু হয়। এ ঘটনার মামলায় ইফতেখার ফারদিন দিহান কে গ্রেফতার করেছে। সে ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানন্দিও দিয়েছে।

 ১২ টা ১৯ মিনিটে আনুশকা আমাকে ফোন দেয়:

ঘটনার দিন বেলা ১২ টা ১৯ মিনিটে আনুশকা আমাকে ফোন দেয় তার মোবাইল থেকে । তখন আমি একটা মিটিং এ থাকায় কল কেটে দেই। পরে নানা ব্যস্ততার কারণে তাকে কলব্যাকও করতে পারেনি। আমরা এখন মনে হচ্ছে আনুশকা যখন কোচিং এ যাচ্ছিল তখন হয়তো দিহান তিন বন্ধুকে নিয়ে তাকে রাস্তায় বাঁধা দিচ্ছিলো নয়তো আনুশকাকে যখন তারা নির্যাতন করছিল তখন সে আমাকে ফোন দেয়। ফোনটা না ধরতে পাড়ায় ছিল সব থেকে বড় ভুল। আমি যদি ফোনটা রিসিভ করতে পারতাম, তাহলে আমার মেয়ে আমাকে নির্যাতন বা রাস্তায় বাঁধা দেওয়ার কথা বলত। তখন আমি দ্রুত ব্যবস্থা নিলে ঘটনা এত দূর আসত না। আর আমি মিরপুরে ছিলাম, এমন কিছু জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে চলে আসতে পারতাম। আমরা মেয়েকে তারা প্রেসারাইজড করেছে, না হলে আমার মেয়ে ঐদিকে যাওয়ার কথা না। আমি এসব কথা পুলিশকেও জানিয়েছি।

দিহানের তিন বন্ধুকে কেন সন্দেহ করছে আনুশকার পরিবার:

এ বিষয়ে বাবা বলেন,তাদের সন্দেহ করার কারণ হল, আনুশকাকে যখন হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে দিহান আমার স্ত্রীকে ফোন দেয়, তখন আমার স্ত্রী বলেছিল তোমরা কয় জন আছ। তখন দিহান আমার স্ত্রীকে বলেছিল তারা চার জন আছে। এদিকে স্ত্রী যখন হাসপাতালে যায় তখনও দিহানসহ তার তিন বন্ধুকে দেখতে পায়। অবশ্য দিহান প্রথম ফোনটা আমার স্ত্রীকে তার বাসা থেকে করেছিল যখন আনুশকা অচেতন হয়ে পড়েছিল। তখনও সে বলছে বাসায় সে সহ তার তিন বন্ধু রয়েছে। এছাড়া আমার মেয়েকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে তা একজনের পক্ষে সম্ভব নয়। এছাড়া ঢামেক হাসপাতালের অনেক পরিচিত ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি যে, একজনে এই কাজটা করে নাই।  তাকে নানানভাবে পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছে।এখন এসে বিভিন্ন ভাবে জানতে পেরেছি দিহানের তিন বন্ধুও জড়িত আছে । তাই তাদের প্রতি আমাদের সন্দেহ হচ্ছে। এছাড়া দিহানের তিন বন্ধুর মধ্যে একজনের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। সে কোথায় থেকে এসেছে এবং কেন এসেছে। কিন্তু এখন তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

দিহানসহ তার তিন বন্ধু জড়িত থাকার সন্দেহ করলে মামলার এজাহারে কেন শুধু  দিহানের নাম:

এই প্রশ্নের জবাবে আনুশকার বাবা বলেন, মামলার এজাহা্র যখন লিখে তখন আমি বলেছিলাম চার জনকেই আসামি করা হোক।  মামলার সময় পুলিশ আমাদের বলেছিল বাকি তিন জনকেও তারা আসামি করতে পারে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পর ওদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিবে।  তখন আমিও দেখলাম ঠিকই আছে তারা যদি নিরপরাধ হয়ে থাকে কেন আসামি করা হবে। একটা ছেলের জীবন তো শুধু শুধু নষ্ট করা যায় না। কিন্তু ওই প্রতিবেদন আসার আগেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হল। কিন্তু ঘটনাস্থলে তারা চার জন ছিল দিহান ফোনে বলেছিল। মামলার করার পর বুঝলাম এই বিষয়ে আসলে আমি কিছুই জানতাম না। পরে অনেক তথ্য জানতে পেরেছি।

মামলার করার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করেছিল আনুশকার বাবা:

এ বিষয়ে ভিকটিমের বাবা বলেন, ঘটনার দিন আমাদের সময়টা নষ্ট হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আমাদের প্রথমে ঢামেক হাসপাতালে পাঠানো হয় ময়নাতদন্তের কাগজ তৈরি করতে। কাগজ পত্র তৈরি করতে আমাদের অনেক সময় নষ্ট হয় যায়। ফলে ঢামেক হাসপাতাল থেকে আসতে দেড়ি হয়ে যায়। আর এই কারণে কলাবাগান থানায় আমরা মামলা করার জন্য খুব বেশি সময় পায়নি। কিন্তু ময়নাতদন্ত হয়েছে এর পরের দিন বিকেলে। এখন মনে হচ্ছে ঢামেক হাসপাতালে বেশি সময় লাগার পিছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। যার ফলে আমরা মামলা করতে কম সময়ও সব তথ্য ঠিকভাবে মামলায় উপস্থাপন করতে পারেনি।  আমরা যদি  ঘটনার পরের দিন মামলাটা করতে পারতাম তাহলে বাকি তিন জনকেও অভিযুক্ত করা যেত। তবে তাদের এত দ্রুত ছেড়ে দেওয়া হবে ভালোভাবে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া তা আমরা বুঝতে পারি নাই। কেননা পুলিশ তখন বলেছিল  একজনকে দিয়ে মামলা হলেও বাকিরা জড়িত থাকলেও তাদের আসামি করা হবে।

দিহান ও তার তিন বন্ধু আইনি প্রক্রিয়ায় কি বেশি পাচ্ছে:

এ বিষয়ে আনুশকার বাবা বলেন, আমরা মনে হচ্ছে তারা বেশি কিছু বিষয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে। কেননা ময়নাদন্তের কাগজ তৈরি করতে কালক্ষেপণ ও দ্রুত ওই তিন জনকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি আমাদের মনে সন্দেহ তৈরি করছে। এছাড়া আমরা বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছি তারা প্রশাসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।

ভিকটিমের বাবার এসব অভিযোগের বিষয়ে  ডিএমপির রমনা বিভাগের নিউ মার্কেট জোনের সহকারী কমিশনার আবুল হাসান  বলেন, মামলার বাদী তো আনুশকার বাবা নিজেই। তিনি তারা আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে মামলাটি করেছেন। তাহলে এখন কেন এসব অভিযোগ করছেন  তিনি বুঝতে পারছি না। এছাড়া ঘটনার দিন সঙ্গে সঙ্গে আমরা ওই তিন জনকে আটক করি দিহানসহ। তাদেরকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের মোবাইল প্রযুক্তিগত পরীক্ষা শেষে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া হয়। মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে যখন প্রয়োজন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া আনুশকার মা বাবাকে আমরা দ্রুত ডাকাব। তাদের অন্য কোনো অভিযোগ থাকলে আমরা শুনব। পুলিশ নিরপেক্ষভাবে মামলার তদন্ত করে যাচ্ছে কাউকে বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। 

উল্লেখ, গত ৭ রাজধানীর কলাবাগানে ডলফিন রোডে নিজ বাসায় মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী আনুশকা নূর আমিন ওরফে শাহনূরীকে ধর্ষণ করে দিহান। পরে সে অচেতন হয়ে গেলে তাকে কলাবাগানের আনোয়ার খান মর্ডান মেডিকেল কলেজ হাসপালে নিয়ে যায় দিহান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত্যু ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় দিহানও তার তিন বন্ধুকে আটক করে পুলিশ।

ঘটনার দিন রাতে কালবাগান থানায় দিহানকে আসামি করে আনুশকাকে ধর্ষণ ও হত্যার কারার অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ এর ২ ধারায় খুনসহ ধর্ষণ মামলা করেন তার বাবা।

পরে এই মামলায় শুক্রবার (৮ জানুয়ারি) দিহানকে আদালতে তুলা হলে হলে সে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

এদিকে শুক্রবার বিকেলে আনুশকার মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে কা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ফরেসনিক বিভাগের প্রধান ডা.সোহেল মাহমুদ বলেন,আনুশকার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।  শিক্ষার্থীর যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথ দুই দিক দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। ময়নাতদন্তে দেহের দুই অংশেই আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে ধস্তাধস্তির কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

চেতনানাশক কিছু খাওয়ানো হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, চেতনানাশক কোনো কিছু খাওয়ানো হয়েছিল কি না তা জানার জন্য নমুনা সংগ্রহ হয়েছে। ঘটনাস্থলে একাধিক ব্যক্তি ছিল তার ডিএনএ নমুনা এবং ভিসেরাও সংগ্রহ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকায় দিহানের তিন বন্ধুকে ছেড়ে দেয় পুলিশ শুক্রবার রাতে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin