রাজাকার শাবক চেনার উপায় জানালেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এ.আরাফাত

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

রাজাকার শাবক কারা? রাজাকার শাবক কিভাবে চিনবেন? এই শিরোনামে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষক মোঃ এ আরাফাত তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে একটি স্টাটাস দিয়েছেন আজ, সেটি নিচে হুবুহু তুলে ধরা হলো।

-একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে, একজন সমাজ সচেতন মানুষ হিসেবে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের আলাপে আমি বেশ কিছু বিষয় পর্যবেক্ষণ করেছি। আমি উপলব্ধি করেছি কি সূক্ষ্মভাবে কিছু মানুষ তার মনের গভীরে রাজাকার সত্তা লালন করেন।

আমার দৃষ্টিতে ‘রাজাকার’ একটি আদর্শিক অবস্থান। পাকপন্থী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীদের আমরা রাজাকার বলি।

** রাজাকার শাবক কারা -এটা বুঝতে হলে, রাজাকার ছিল কারা তা বোঝা জরুরি:
-যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি এবং বাঙালি হয়েও বাংলাদেশের বিপক্ষে গিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল তারাই ছিল রাজাকার।

**কেন তারা নিজ দেশ ও জাতির বিপক্ষে গিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে রাজাকারি করেছিল?

-কারণ যে আদর্শ নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেই আদর্শ তারা বিশ্বাস করে নি, তারা বিশ্বাস করতো পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শে। ৭১ এ যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, রাজাকারদের ভাষায় তারা ছিল ভারতের দালাল।

৭৫ এর ১৫ই আগস্ট, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পরেই এই রাজাকার গোষ্ঠী আবারও শিকড় গেড়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করে বাংলাদেশ এবং তাদের পরবর্তী একটি প্রজন্ম তৈরি করে যারা বয়সের কারনে মুক্তিযুদ্ধে রাজাকরি করার সুযোগ না পেলেও একই রাজাকারি আদর্শে বিশ্বাস করতে থাকে যদিও তাদের জন্ম ও বসবাস স্বাধীন বাংলাদেশে। রাজাকার গোষ্ঠী এবং তাদের শাবকরা স্বাধীন বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্যুত করে পাকিস্তানি ধারায় পরিচালিত করার প্রাণান্ত চেষ্টা করে।

বাংলাদেশের দেশপ্রেমী প্রজন্মের একটি বড় অংশকে রাজাকার গোষ্ঠী ‘ভারত বিরোধী জুজু’ দেখিয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে বিভ্রান্ত করার মধ্য দিয়ে নিজেরা পাক-প্রেমিক হলেও দেশপ্রেমিকের ছদ্মবেশ ধারণ করে, এবং দেশপ্রেমী অংশের সাথে মিশে যায়। শুধু তাই নয়, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, আসল দেশপ্রমী তাদের ভারতের দালাল তকমা দিয়ে অপপ্রচার করতে থাকে। ৭১ এ যেমন রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতের চর বলতো, ঠিক তেমনই রাজাকার শাবকরা বর্তমান সময়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের একইভাবে ভারতের দালাল বলে।

কাজেই, যাদের জন্ম ৭১ এর পরে হয়েছে বলে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারি করতে পারেনি কিন্তু তারা স্বাধীন বাংলাদেশে জন্মে এবং বসবাস করেও ৭১ এর রাজাকারদের একই আদর্শ ধারণ করে, তারা রাজাকার না হলেও তারা রাজাকার শাবক। দেশপ্রেমী প্রজন্মের একটি বড় অংশ এই রাজাকার শাবকদের অনেক ক্ষেত্রেই চিনতে ব্যর্থ হয়।

৭১ এ প্রকাশ্যে দেশবিরোধী ভূমিকা নেয়ার জন্য রাজাকারদের তো আমরা চিনি কিন্তু রাজাকার শাবকদের আপনি কিভাবে চিনবেন? আমি, রাজাকার শাবকদের কতগুলো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরছি। এই বৈশিষ্ট্যগুলো যার মধ্যে থাকবে সে নিশ্চিতভাবেই রাজাকার শাবক।

(১) কেউ যদি ৭৫ এর ১৫ই আগস্টকে বিপ্লবের দিন বা নাজাত দিবস মনে করেন তাহলে সে রাজাকার শাবক।

(২) কেউ যদি আরেকটা ১৫ই আগস্টের জন্য মনোবাসনা প্রকাশ করেন তাহলে সে রাজাকার শাবক।

(৩) কারো যদি ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে অ্যালার্জি থাকে তাহলে সে রাজাকার শাবক।

(৪) কেউ যদি বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে না চায়, পাকিস্তানের মতো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় তাহলে সে রাজাকার শাবক।

(৫) কেউ যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক হন, তাহলে সে রাজাকার শাবক।

(৬) যুদ্ধাপরাধের বিচার এত বছর পরে করার কী দরকার ছিল-এমন প্রশ্ন যার মনে উকি দেয় সে রাজাকার শাবক।

(৭) যুদ্ধাপরাধের বিচার যথেষ্ট পরিমাণে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের হয়নি বলে যার কাছে প্রতীয়মান হয় সে রাজাকার শাবক।

(৮) যার কাছে মনে হয় মুক্তিযুদ্ধ তো অনেকদিন আগের কথা এবং পাকিস্তান এখন আর আমাদের ক্ষতি করার মত কোন অবস্থায় নেই, কাজেই মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের নৃশংসতা নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করার কিছু নেই তাহলে সে রাজাকার শাবক।

(৯) যার কাছে মনে হয় পাকিস্তান আমলই ভালো ছিল, বাংলাদেশ হয়ে কি লাভ হয়েছে, তাহলে সে রাজাকার শাবক।

(১০) যে বাংলাদেশের বিপক্ষে ক্রিকেট খেলায় পাকিস্তানকে সমর্থন করে, সে রাজাকার শাবক।

(১১) পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী ৭১ এ বাঙালি নারীদের সম্ভ্রম হানি করেছে-এ বিষয়টি যদি কারো কাছে এমন মনে হয় যে ‘যুদ্ধে তো কতকিছুই হয়, এটা এমন কোন ব্যাপার না’ -তাহলে সে খাঁটি রাজাকার শাবক।

(১২) পাকিস্তানের কাছে নিউক্লিয়ার বোমা আছে, এই জন্য যদি কেউ মনে মনে বা প্রকাশ্য গর্ববোধ করে-যেন পাকিস্তানের নিউক্লিয়ার বোমা তার মান-মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়, তাহলে সে রাজাকার শাবক।

(১৩) যে নিজে বিএনপি বা অন্য কোন দলের সমর্থক (তেলবাজ/ দালাল) হওয়া সত্ত্বেও, অন্য কেউ বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ সমর্থক হলে তাকে ‘তেলবাজ’ বা ‘দালাল’ বলে গালি দেয় তাহলে সে রাজাকার শাবক।

(১৪) কেউ যদি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের যুদ্ধ হিসেবে না দেখে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ হিসেবে দেখে তাহলে সে রাজাকার শাবক।

(১৫) কেউ যদি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল প্রমুখ ব্যক্তিত্বকে কোন কারন ছাড়াই ঘৃণা করে-আসলে কারন ছাড়া নয়, অবচেতন মনে তাদের অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল অবস্থানের কারনেই তাদের ঘৃণা করে, তাহলে সে রাজাকার শাবক।

(১৬) কেউ যদি বংলাদেশকে ভালোবেসে বাংলাদেশের স্বার্থে ভারত প্রশ্নে শক্ত অবস্থান নেয় তাহলে সে দেশপ্রেমিক, কিন্তু সে যদি পাকিস্তানের চশমা পরে ভারতবিরোধী হয় তাহলে সে রাজাকার শাবক। কারন তার পিতারা পাকিস্তানকে ভালোবেসে ভারতবিরোধীতা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। আজ তারা ভারত বিরোধিতা করে পাকিস্তানের চশমা পরে, তারা প্রয়োজনে বাংলাদেশেরও বিরোধিতা করবে তাদের রাজাকার পিতার মতো। কাজেই তারা দেশপ্রেমিক নয়। তারা পাক-প্রেমিক।

(১৭) যে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে এবং পাকিদের মতো ৩০ লক্ষ শহীদের সংখ্যাকে কমিয়ে ৩ লক্ষে দেখাতে চায়, সে পাকিদের দোসর এবং রাজাকার শাবক।

**আমি ব্যক্তিগতভাবে কিভাবে ওদের শনাক্ত করি?
*আমাকে নিয়ে ওরা যে ভাষায় মন্তব্য করে তা দেখে আমি ওদের শনাক্ত করি।
-মুক্তিযুদ্ধের কথা বললে, ওদের ভাষায় আমি ‘চেতনাবাজ’
-বঙ্গবন্ধুর কথা বললে, ওদের ভাষায় আমি ‘ভারতের দালাল’
-আওয়ামী লীগের কথা বললে, ওদের ভাষায় আমি ‘দেশদ্রোহী’
-শেখ হাসিনার কথা বললে, ওদের আমি ‘জাতশত্রু’

পাকিস্তানের পা-চাটা দালাল, ৭১ এর রাজাকার, ওদের পিতারাও মুক্তিযোদ্ধাদের যে কথা বলতো, আজকের রাজাকার শাবকরা আমাদের সেই একই কথা বলে।

পরিশেষে যা বলতে চাই, তা হলো, সরকার সমালোচক বা আওয়ামী লীগ সমালোচক হলেই আপনাকে ‘রাজাকার শাবক’ বলার সুযোগ নেই। আপনার মধ্যে যদি উপরে উল্লেখিত এমন কোন রাজনৈতিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য না থাকে এবং আপনি যদি একজন সরকার সমালোচক হন বা আওয়ামী লীগের সমালোচক হন, সে ক্ষেত্রে আমি আপনাকে রাজাকার শাবক বলবো না। তবে অবশ্যই আমি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আপনার সমালোচনার জবাব দেয়ার চেষ্টা করব অথবা আপনার বক্তব্য মেনে নিব।

আমি এও জানি যে উপরে উল্লেখিত রাজনৈতিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধারণকারী তথা রাজাকার শাবকের সংখ্যা ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে অতি নগন্য, হয়তো দেশের পুরো জনগোষ্ঠীর ১% হবে, তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের ফেইক আইডি সহ উপস্থিতি অনেক বেশি এবং উপস্থিতির ব্যাপ্তিও প্রচুর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের লম্ফ-ঝম্ফও অনেক। এরা তাদের প্রতিটি কমেন্টের মধ্য দিয়ে তাদের রাজাকার শাবকীয় চরিত্রের সিগনেচার রেখে যায়, যা খুব সহজেই ধরা যায়।

সবচেয়ে মজার কথা হলো ‘রাজাকার শাবক’ বললে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১ শতাংশ আসল রাজাকার শাবকদের গায়ে যেন ফোস্কা পড়ে যায়। দেশের ৯৯ শতাংশ দেশপ্রেমিক সাধারন মানুষের কিন্তু এ বিষয়ে কোন সমস্যা নেই। কারন এদেশের মানুষ জানে, এদেশে এখনও আটকে পড়া পাকি প্রেতাত্মা এবং তাদের আদর্শিক বংশধররা আছে। যে নিজে রাজাকার শাবক না, এই বিষয় নিয়ে তার কোন ‘অ্যালার্জি’ বা ‘বিভ্রান্তি’ থাকারও কথা নয়। ‘রাজাকার শাবক’ বলে তাদের উল্লেখ করলে, আসল রাজাকার শাবকরাই বিচলিত হয়।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin