যদু মুন্সি !

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

যদু মুন্সি আমাদের গাঁয়ের সুপরিচিত মুখ। সারা গাঁয়ে এমন কোন ঘর হয়ত পাওয়া যাবে না যে ঘরে যদু মুন্সি অন্তত একটা গ্লাস লেবু চিনির শরবত অথবা পানি পান করে নাই। গো-মাংসো সাথে সাদা ঝরঝরে ভাত আর থকথকে আঠালো ঝোল তরকারি তাঁর বেজায় পছন্দ।

যাঁর সাধ্যে কুলোয় সে মুন্সিকে ঘরে ডাকলে এই উপাদেয় খাদ্যের জোগাড়ও করে। গাঁয়ের প্রায় সকল পাড়া, এমনকি পার্শ্ববর্তী পাড়াগাঁয়ের ঘরগুলোতেও তাঁর পায়ের ধুলো পড়েছে এই কথা একেবারে নিশ্চিত। আমার বুঝ-জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি যদু মুন্সি পাড়ার প্রায় সকল ঘরের মেয়ে ছেলে ছোকরাদের আল্লা নবীর কেতাব কোরআন পড়া শেখায়। গাঁয়ের সকল ঘরে,ঘরের মানুষজনের কাছে মোটামুটি একরকম সমাদৃত এই যদু মুন্সি। মুন্সির থুতনিতে এক গোছা পাতলা দাঁড়ি। সদাই হাকিমপুরি জর্দা ও কাটা তামাক পাতা মিশ্রিত পান চুন তাঁর ভরাট গালে শোভা পায়। কথা বলার সময় লাল পিচকি তোলা সেই চিবানো পানের রস মুখের দুপাশে বেড়িয়ে আসার উপক্রম হলেই যদু মুন্সি তাঁর বাম হাত দিয়ে মুখটা মুছে পূনরায় চোয়ালখানি অবিরাম চালাতে থাকে।

গালগপ্পো করতে করতে তাঁর মুখমন্ডলের নানান শ্রী বিচিত্রে আমি মুগ্ধ হই নাই, তবে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছি। দুর্ভাগ্যক্রমে আমার আল্লা নবীর কেতাবের আলিফ, বে, তে পড়ালেখা তাঁর হাতে শুরু করা হয় নাই। তাই আমার ঘরে তাঁর যাতায়াত ও পানি পান কি আহার কোনটাই সম্ভব হয় নাই। সারা গাঁয়ে এই অদ্ভুত ঘর হাত গুনলে এক হাতের কড় সবগুলো ফুরোবে বলে মনে হয় না। মুন্সির উদর বেশ বড়সড়। বিশাল একটা শরীর। গায়ে প্রায়ই কচুপাতা রঙের পাঞ্জাবি, পাজামা ও মাথায় একই রঙের টুপি চড়িয়ে ঘুরতে দেখি। মুখমন্ডল বেশ চওড়া,থুতনিতে ঐ একগোছা দাঁড়ি আর ঠোঁটের উপরে গোঁফ, চোখে সুরমা লাগিয়ে দৈনন্দিন কাজকর্মে নিজের বাটি থেকে বেড়িয়ে আসে যদু মুন্সি। এই ঘরে ঐ ঘরে, এ পাড়ায় ঐ পাড়ায় আল্লা নবীর কেতাবের হাতেখড়ি দেয় আর মোনাজাত ধরে কিছু পয়সা পায়। তাই দিয়ে মন্সির পরিবারের ভরনপোষণ চলে বলে আমি জানতাম। তাঁর এ পর্যন্ত তিন তিন খান বিবি সেবাদাসী হয়ে তাঁর চারটি বাড়ির তিন বাড়িতে তিন জন সুখে শান্তিতে থাকে এই কথা আমি আচমকাই কয়েকদিন আগে জানতে পারলাম।

এই বিশেষ লোকটির ওপর তেমন আগ্রহ না থাকায় আমি কাছে থেকে খোঁজ খবর না নিলেও মুন্সি নিজে আমাকে তাঁর খোঁজ খবর নিতে বাধ্য করল। খোঁজে জানা ফলাফল এই যে, যদু মুন্সি এ গাঁয়ে ও গাঁয়ে জমিজমা, বাড়ি-ঘর ক্রয় বিক্রয়ের মধ্যস্থতা করে এবং সেখান থেকেও কিছু হালাল পয়সা আর সুযোগ পেলে ডান-বাম উভয় হাতে তাঁর মহান ট্যাকে গোজে । এইতো কয়েকদিন আগে পাড়ার এক চাচা’র মুখে শুনলাম ” মাস্টার মিঁয়া, ঐ যে মহামারী লাগলো। এর লইগ্যা ইস্কুল বন্ধ দিয়া দিল। পোলাডারে আর ইস্কুলে পাডাইতে পারলাম না। হ্যাসে কি করলাম জানো নি…? -না,বলুন, তাহলে জানতে পারি। – ইস্কুলে গিয়া মাসে মাসে কাজ লইয়া আইতাম । এই ফাকে আরেক কাম করলাম- যদু মুন্সিরে বাইত ডাক দিয়া লইলাম। এক হাজার টাকা মাস দিমু। পোলাডারে আল্লা তালার কোরআনের আলিফ বে তে ধরাইয়া দেওন লাগবো। অহন হ্যায় ডেইলি পড়ায়। মাঝে মইধ্যে না আইলে পরের দিন একলগে পড়ায়া পোষাইয়া দেয়। পোলায় আগামী চাঁন্দে কোরআন ধরবো। ভাবতাছি যদু মিয়ারে দিয়া খাস একটা মোনাজাত লওয়ামু আর মুন্সিরে কিছু বখশিশ দিয়া পোলারে কেতাবডা ধরামু।

” -বেশ তো। মুন্সি প্রায়ই পথের এপাশে ওপাশে পাড়ার মানুষের সাথে কথা বলে। এ দোকানে ওদোকানে বসে নানান কর্ম ফয়সালার চেষ্টা করে। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর দুই চার বাক্য আমার কর্ণগহব্বরে প্রবেশ করাতে পেরেছি। বুঝতে বাকি রইল না যে, কথার মারপ্যাঁচে যদু মুন্সি তাঁর এই সুষম প্রতিভা বেশ সুকৌশলে সম্পাদনায় পটু। মুন্সি কয়েকজন কন্যা সন্তান আর একটিমাত্র পুত্রের জনক। জানামতে সকল কন্যা সুপাত্রী এবং সু-পাত্রস্থ হয়েছে। পুত্রটি হয়ত কয়েক মাস হয় বিবাহের কাজ সম্পন্ন করেছে। শুনলাম যদু মুন্সি ইদানীং তাঁর ৪র্থ বিবাহের জন্য একজন যুবতীর খোঁজ করে চলেছে। গত কয়েকদিন আগে আমি রাস্তার ধারে পরিচিত এক চাচার দোকানে বসে গল্প করছিলাম। এমন সময় মুন্সি হাতে একটা লাউ নিয়ে দোকানে ঢুকলেন। -কিও বরকত মিয়া লাউডা দেখছো নি…? -কত দিয়া লইলেন ভাই..? – আর কইও না, যা দাম। তয় আমি দেইখা মনে অয় তিরিশ ট্যাকায় দিল। – হ ভাই, আপনেরে দুই পয়াসায় কম খাওয়াইলে লোসকান নাইগা ।

আপনে আমাগো পাড়ায় আল্লা তালার কেতাব পড়ান, মোনাজাত করান। আপনের মত জান-পড়নেওয়ালা মানুষের লইগ্যা কয়ডা পয়সা কম রাখলে আল্লার বরকত নাজিল অইবো। -তোমার কথায় পরাণ ঠান্ডা অয় বরকত মিয়া। যাওন আহনের বেলায় এর লইগ্যাই তোমার দোকানে ইট্টু বই,দুইডা কথা কই। শান্তি লাগে। – আপনে মেহেরবান যদু ভাই। – বরকত মিয়া , একটা কথা কইতাম। -কইয়ালান ভাইসাব। – তুমি তো মনেঅয় জানো আমার এহানে চাইড্ডা বাড়ি আছে। তিন বাড়িতে তিনডা বিবি সেটেল কইরা রাখছি। – হ ভাইসাব, আপনের দিল দরিয়ার লাহান মহৎ। আপনের মন দিলের হিসাব কিতাব আলাদা। – বরকত মিয়া, তোমার মাইয়াডারে আমি কত যত্নেই না পড়াইলাম, শিখাইলাম। অহন তো অয় টাইন্যা কোরআন পড়বার পারে। – হ ভাই। মাইয়াডা হপায় আল্লার কেতাবটা পড়বার পারে আলাহামদুলিল্লা! দ্যাখতেও মাশয়াল্লা। বিয়া সাদি দেওন লাগবো। অর ওপরে আপনের দোয়া আছে ভাইসাব। কি যত্ন কইরা অরে আপনে আলিফ বে তে ধরাইছেন। অহন টাইন্যা টাইন্যা মাইয়া আমার সকাল সন্দ্যায় কোরআন পড়ে।

– তাই নাকি। তা বরকত মিয়া আমি আমার ৪র্থ বিবাহ করতে চাইতাছি,মাইয়া খোঁজতাছি। – ভালো কথা। ভাই, আপনের মন দিল দরিয়া, পড়নেওয়ালা মানুষ। বিবি তিন জন,সকলের ঘরেই তো পোলাপান আর অগো বিয়া সাদিও অইছে। আপনে অহন আবার এই বিয়া করবেন…? – বরকত মিয়া, এইডাই তো বোঝলা না। বিবি তিনটা। বাড়ি তো চাইড্ডা। চাইর নম্বর বাড়ির লইগ্যা তোমার মাইয়াডারে দিয়া দেও না মিয়া। দ্যাখতে ডাগর, বড় অইছে।

আমার কাছে হুরপরীর লাহান লাগে। অরে আমি আমার ঐ বাড়িতে সাজাইবার চাইতাছি। আর তুমি তো জানোই আমি সায়-সম্পদের দালালি কইরা ডাইন বাম হাতে পয়সা কামাই। আর মিয়া আমার এক মোনাজাতের দামই তো হাজার ট্যাকা। খালি পইড়া দিমু, “রব্বানা যলামানা আনফুসানা অইল্লাম তাগফিরলানা অয়াতারাহামনা লানা কুনান্না মিনাল খা-সীরিন”। – আমীইইইন

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin