বেসামাল দর্শক !!

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

আজকাল বেশিরভাগ মানুষেরি এক প্রকার অভিযোগ হল ভুলে যাওয়া অথবা কোনো কিছুর প্রতি মনোযোগ কমে যাওয়া। যে কাজগুলতে আমরা অনেক আগ্রহ পেতাম সেই কাজগুলোতেই আমরা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি, ভাবছি আগের মত স্বতস্ফূর্ততা নাই। অনেকে আবার নিত্যদিনের জীবনে এতটাই ব্যস্ত যে তারা কোন কাজ ছেড়ে কোন কাজ করবে তা গুছিয়ে নিতে পারেনা।

এই ভুলে যাওয়া , আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, কাজে অগুছানো মনোভাব সব মিলিয়ে আমরা হয়ে যাচ্ছি বেসামাল।এখন যে যুগে মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তরা বাস করছি যুগটাকে আমি আক্ষায়িত করতে চাই বেসামাল যুগ হিসেবে। বেসামাল বলতে অনেক কিছুই অনুমান করা যায় তবে আমি যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলবো তা হলো বিনোদন।

বিনোদনের ইতিহাসে যদি চোখ দেই তাহলে গুগলের মতে ,৬০০ খ্রিষ্টপূর্বে ইউরোপের দিকে থিয়েটার প্রথম জনপ্রিয় হয়। থিয়েটার বলতে একদল মানুষ বিভিন্ন প্রকার অনুষ্ঠান মঞ্চায়িত করতো যা মৌষুমে একবার এক এলাকায় হতো।অবশ্যই তৎকালীন আমলে তো আর এখনকার দিনের মতো এতো এডভান্সড সাউন্ড সিস্টেম ছিলনা বলে খুব নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ উপভোগ করতো এই মঞ্চায়ন, দর্শকদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল তৎকালীন সমাজ ব্যাবস্থা অনুযায়ী প্রগতিশীল বিত্তবানেরা। এই মঞ্চায়ণের চমৎকার এক বিবর্তন এলো যখন ‘সিনেমা’ বা যান্ত্রিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত চলচিত্রের আবির্ভাব হয়।

থিয়েটার

যার প্রথম বানিজ্যিক প্রচারনা হয় ১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে এক স্বল্প দৈর্ঘ ‘লুমিয়ের ব্রাদার্স’ নামক চলচিত্রের মাধ্যমে, প্যারিসে।ওই দিন থেকে আজ অব্দি চলচিত্রের সফলতা ভাষায় বলাটা নিষ্প্রয়জন কিন্তু তার পরেও এই ব্যাপক খ্যাতিপূর্ন বিনোদনের সময়সিমাও ছিল গড়ে ২ ঘন্টা এবং যা বড়জোর একটা সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক আনন্দ লাভের মাধ্যম ছিল। ১৯২৮ সালে প্রথম ‘কুইন্স ম্যাসেঞ্জার’ নামক নাটক দ্বারা টেলিভিশন মানুষকে বুঝায় যে তাকে আর বিনোদিত হতে ঘরের বাইরে সময় ব্যয় করতে হবেনা বরং বাসায় কিছু নির্দিষ্ট সময়ানুযায়ী সে তা উপভোগ করতে পারবে। এর মধ্যে রেডিওর ভুমিকাও অনস্বিকার্য কিন্তু আমি রেডিওর কথা বলবনা কারন তার দর্শক নেই স্রোতা আছে। ৮০র দশকের আগ পর্যন্ত মানুষ থিয়েটার, সিনেমা আর টেলিভিশন তিন বিনোদন মাধ্যম নিয়ে যখন প্রবলভাবে সৃজনশীল তখন বিনোদন কে আরো সহজলভ্য করলো ভি সি আর (১৯৭৫রে জাপানে) তার হাত ধরে সিডি (১৯৮২তে সনি কোম্পানির মারফতে) মানুষকে আবারো জানালো সিনেমা দেখতেও তার বাইরে যাবার দরকার নেই।

স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘লুমিয়ের ব্রাদার্স’

এই মাল্টিমিডিয়া ঠেকল এখন স্মার্ট ফোনে যা প্রথম বাজারজাত হয় ২০০৮ সালে এইচ টি সি ড্রিম দ্বারা। এই ইতিহাসগুলা ঘেটে দেখেন, ৬০০ খৃষ্টপূর্ব (সিনেমা) থেকে ১৮২৫ খৃষ্টাব্দ (সিনেমা) = ২১০০ বছর (প্রায়), ১৮২৫ থেকে ১৯২৮ (সিনেমা থেকে টেলিভিশন) = ৪৩ বছর, ১৯২৮ থেকে ১৯৭৫ = ৪৭, ১৯৭৫ থেকে ২০০৮ = ৩৩ বছর কালক্রমে বিনোদন মাধ্যমের বিবর্তন । যখন মাধ্যমটা শুধু থিয়েটার আর সিনেমা ছিল তখন বিনোদিত হওয়া ছিল মানুষের প্রচন্ড আগ্রহ ও পারিপার্শ্বিকতার উপর। সাধারনত মধ্যবিত্ত ঘরের খেটে খাওয়া মানুষ এই বিনোদনকে বিলাসিতা বা উৎশৃংখলতা বলে আক্ষায়িত করতো। বলা যায় সমাজের বেশিরভাগ মানুষ এই বিনোদন থেকে বঞ্চিত হত প্রায় ৭০ দশকের আগ পর্যন্ত। এমনকি টেলিভিশনও শুরুর দিকে বিলাসিতার খাতায় ছিল এবং এর প্রচারণাও হত কিছু সময়ের জন্য। মানে ২৪ ঘন্টার বিনোদন ৯০ দশক পর্যন্ত ছিলনা। সাধারনত বিনোদনের জন্য মানুষ তখন সময়কে বার করে নিত যেমন সন্ধার পর বা ছুটির দিনে। এই অল্প সময়ে মানুষ বিনোদিত হলেও বিনোদনের রেশ থাকতো বহু দিন।

ভি সি আর

সিনেমার ডায়লগ হোক, নায়িকার পোশাক, গানের কথা বা নাচের মুদ্রা সব অবিকল মাথায় গেথে যেত এক বারেই। কারন আমরা যখন বিনোদিত হই তখন আমরা খুশি থাকি বিজ্ঞানের ভাষায় তখন আমাদের মগজ থেকে অনের ডোপামিন নামন আনন্দের হরমোন বের হয় যা আমাদের মগজ তথা আমাদেরকে মানষিকভাবে অনেক স্বতস্ফুর্ত রাখে। এখন ঐ প্রত্যাবর্তনের ধারাবাহিকতায় এখনকার বনোদনের মাধ্যম হলো মুঠোয় ধরে রাখা স্মার্ট ফোন। নিরলস পরিশ্রম, অনেক সময় আর ব্যাপক ইচ্ছাশক্তি দিয়ে আগে যে সৃজনশীল চর্চার ফলস্বরুপ বিভিন্ন শীল্পকলা নাট্যানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, সঙ্গীতানুষ্ঠান নামে প্রচারণা হতো এখন এই ক্রিয়েটিভিটি ঠুংকো কন্টেন্ট ক্রিয়েশনে দেখানো হয় ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক সহ অন্য মাধ্যমে । আপনি আমি যে স্ক্রল ডাউন করতে করতে অসংখ্য কন্টেন্ট দেখছি, যা ভালোলাগছে তা কয়েকবার দেখছি আর যা মোটামোটি তাও ৫-১০ সেনেন্ড দেখা হচ্ছে।

আপনার লাইক, কমেন্ট আর শেয়ার পাওয়ার জন্য এই লক্ষ লক্ষ কন্টেন্ট আপনাকে আর কতক্ষন ডোপামিন দিয়ে খুশি করতে পারবে? মগজ যখন প্রয়োজনের থেকে বেশি স্বতঃস্ফূর্ত থাকে কোন এক কারণে তখন তা নেশার পর্যায়ে চলে যায়। একদম নেশাগ্রস্থ হয়ে না পড়লেও আপনি কি পড়া বা অফিসের যেকোন কাজ মোনযোগ দিয়ে করার কিছুক্ষন পরই কোন অ্যাপ খুলে এই কন্টেন্ট দেখতে বসে পড়েন না? আপনি জানেন আপনার কাজ করাটা কতটা জরুরি তবুও মনের অজান্তেই হাত চলে যায় বা কোন নটিফিকেশন খুলতে গিয়ে। আজকের দিনে যারা ভাইরাল কন্টেন্টগুলো দেখেনাই তারা ব্যাকডেটেট।

ভাইরাল কন্টেন্ট

কখনো আপনিও এই স্ক্রল ডাউন করতে করতে ক্লান্ত কিন্তু নিজেকে থামাতে পারেন না। আমরা কখনো বুঝিও না কোথায় থামতে হবে আবার বুঝলেও থামাতে পারিনা। বেসামাল হওয়া কি একেই বলেনা? অবশ্যই প্রতিদিনের ক্লান্তি থেকে খনিকের স্বস্তির নামই বিনোদন। থিয়েটার আর সিনেমা ছিল তখন বিনোদন উপভোগ করাটা ছিল মানুষের প্রচন্ড ব্যাক্তিগত আগ্রহের উপর। পারিপার্শ্বিক অবস্থা তখন নিয়মানুযায়ি ছিল।

টেলিভেশন বুঝাল আমরা একটা সময় বের করে নিয়ে আনন্দ উপভোগ করতে পারবো। তখনো মানুষ নিজের সময়কে সাজিয়ে বিনোদিত হতো। কিন্তু এখনকার এই মুঠোফোন কেন্দ্রিক যে অপরিসীম বিনোদন যেখানে বেশিরভাগ বিনোদন অমূলক, স্বস্তা আর অর্থহীন, শুধুমাত্র মানুষের কাছে তা অতিমাত্রা সহজলভ্য হওয়ায় আমরা তার কাছে আমাদের ইচ্ছেশক্তিকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছি। এখনকার প্রেক্ষাপট তাহলে থিয়েটার যুগের মানুষের মতই কিন্তু ক্ষেত্র ভিন্ন। আমাদের প্রচন্ড ব্যাক্তিগত ইচ্ছাশক্তিই পারে আমাদের বেসামাল জীবনকে সামাল দিতে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin