বিশ্ববাজারে সিমেন্টের কাঁচামালের দাম দ্বিগুণঃ উদ্বিগ্ন দেশের উৎপাদকরা

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

আন্তর্জাতিক বাজারে ক্লিংকারসহ কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও জাহাজ সংকটে ভাড়া বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে সিমেন্টের। এতে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে নির্মাণকাজের মূল্যবান উপকরণ সিমেন্টের দাম বেড়েছে। কম্পানিগুলো তাদের সিমেন্টের দাম বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও জাহাজ সংকটে শুধু প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারের দামই কয়েক দফায় গত এক মাসে ৯ ডলার বা ৭৬৫ টাকা বেড়েছে প্রতি টনে। এতে বস্তাপ্রতি ক্লিংকারের খরচ বেড়েছে ৩৮ টাকার ওপরে। এ ছাড়া জাহাজভাড়াসহ অন্যান্য খরচ যোগ করলে ৬০-৭০ টাকা উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রতি বস্তায়। ফলে সিমেন্টের দাম না বাড়িয়ে কোনো উপায় নেই। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকলে সিমেন্টের দাম দ্বিগুণ হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্টের কাঁচামালের অব্যাহত মূল্য বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ)।

বিশ্ববাজারে সিমেন্টের কাঁচামালের দাম দুইভাবে বাড়ছে। ক্লিংকার তৈরির খরচ বাড়ায় রপ্তানিকারক পর্যায়ে যেমন দাম বাড়ছে, তেমনি জাহাজভাড়া বাড়ায় তা আমদানি মূল্যের সঙ্গে যোগ হচ্ছে। সব মিলিয়ে টনপ্রতি ক্লিংকারের দাম এখন ৫৫ থেকে ৫৬ ডলার। ফেব্রুয়ারির শুরুতেও প্রতি টনে চার ডলার বেড়ে ক্লিংকারের দাম ৪৬ ডলারে ওঠে।

সিমেন্টশিল্পে পাঁচ ধরনের কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়। সব কটি আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে ৬২-৯০ শতাংশই হলো ক্লিংকার। গত অর্থবছরেও দেশে এক কোটি ৮৭ লাখ টন ক্লিংকার আমদানি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ) এর প্রেসিডেন্ট ও ক্রাউন সিমেন্টের ভাইস-চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবির বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে পুরোদমে অবকাঠামো উন্নয়নমূলক কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া এশিয়া অঞ্চলে নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ করোনাকালীন নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনের মূল কাঁচামাল উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত অনুযায়ী হয়নি। যার ফলে চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে একটি বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে কোনো কোনো দেশের প্রয়োজনীয় গুরুত্ব বিবেচনায় বেশি দামে নির্মাণসামগ্রীর কাঁচামাল এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎপাদিত নির্মাণসামগ্রী ক্রয় করছে।

তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ায় এখন দেশে প্রস্তুত সিমেন্টের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হলে দ্বৈত কর সমন্বয় করা উচিত। এ ছাড়া আমদানি পর্যায়ে টনপ্রতি নির্ধারিত শুল্ক ৫০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২৫০ টাকা নির্ধারণ করার দাবি জানান তিনি। নির্মাণ খাতের অন্যতম উপকরণটির কারণে যাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য করভার কমানোর অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘দাম সহনীয় রেখে যদি বিক্রি বাড়ে, তাহলে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।’

বাংলাদেশের মতো বিশ্বের অনেক দেশে করোনার ধাক্কা সামলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। নভেম্বরের শুরুতে এর প্রভাব পড়ে ইস্পাতশিল্পে। রড তৈরির প্রধান উপকরণ পুরনো লোহার টুকরার দামে এখনো চলছে উত্থান-পতন। একইভাবে ক্লিংকার তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল কয়লার দাম বাড়ায় প্রভাব পড়ে ক্লিংকারের দামেও। আবার সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের চাপে জাহাজভাড়া গত নভেম্বর থেকেই ঊর্ধ্বমুখী। তাতে নির্মাণ খাতের অন্য উপকরণের মতো এটিরও দাম বাড়ছে।

এদিকে বাজার ঘুরে দেখা যায়, এর মধ্যেই সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দামে। হাজারীবাগের রেদোয়ান এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. আশিক কালের কণ্ঠকে বলেন, গত মাসে ফ্রেশ সিমেন্ট বস্তাপ্রতি ৪০৬ টাকা ছিল, এখন ৪১০ টাকা। সুপার কিট সিমেন্টের দাম ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪১০ টাকায়। বসুন্ধরা আবাসিকের গেট এলাকায় মেসার্স এমদাদ এন্টারপ্রাইজে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ম্যানেজার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রত্যেক সিমেন্ট কম্পানিগুলো থেকে বলা হচ্ছে, সামনে দাম বাড়বে।’

মোহাম্মদপুরের রিং রোডে আজমেরী এন্টারপ্রাইজের বিক্রেতা জানান, স্ক্যান সিমেন্টের দাম ১০ টাকা বেড়ে ৪২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। শাহ সিমেন্ট এত দিন ৪০০ টাকায় বস্তা বিক্রি করলেও বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৪১০ টাকায়। তবে ঢাকার সব জায়গায় সিমেন্টের দাম এখনো বাড়েনি। কিছু বাজারে আগের মাল থাকায় আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে।

নির্মাণশিল্পের প্রধান উপকরণের মধ্যে পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় সিমেন্ট। করোনার শুরুতে এই খাত বিপর্যস্ত হয়েছে। তবে খুব দ্রুতই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে খাতটি। গত বছরের শেষ ছয় মাসে ২০১৯ সালের তুলনায় সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানি বেড়েছে ২২ শতাংশ। নির্মাণ খাতের অন্য উপকরণ রডের দাম বাড়লেও সিমেন্টের দাম স্থিতিশীল ছিল। তাতে এই খাতে বিক্রিও বেড়েছে।

সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা জানান, বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান উপকরণের মধ্যে আছে সিমেন্ট, রড, পাথর ও ইট। এসব নির্মাণ উপকরণের সামনে চাহিদা বাড়বে। পদ্মা সেতু হলে দক্ষিণবঙ্গের ২১টি জেলার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হবে। এই ২১টি জেলায় শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক ভবনের মতো অবকাঠামো তৈরি হবে। ঢাকার ছোট-বড় শিল্প-কারখানা বাইরে স্থানান্তর করা হবে। নতুন কারখানা হবে। আবার কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণকাজ শেষ হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে অবকাঠামো উন্নয়নে গতি বাড়বে। এতে অবকাঠামো নির্মাণের প্রধান উপকরণ সিমেন্টের চাহিদা বাড়বে। এই উপকরণের দাম যদি অস্থিতিশীল হয়, তাহলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও স্থবির হবে। এরই মধ্যে রডের দাম বাড়ায় দেশে জরুরি ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে অবকাঠামো নির্মাণে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির হিসাবে, বর্তমানে দেশে ৩৭টি সিমেন্ট কারখানা রয়েছে। ছয় বছরে সিমেন্ট বিক্রিতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০১৬ সালে। ২০১৫ সালের তুলনায় সে বছর ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। এরপর ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে সিমেন্ট বিক্রি বেড়েছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। সে বছর দেশে তিন কোটি ১৩ লাখ টন সিমেন্ট বিক্রি হয়। অর্থাৎ এক বছরে বাড়তি ৪৩ লাখ টন সিমেন্ট বিক্রি হয়েছিল। ২০২০ সাল বাদ দিলে বছরে গড়ে ৮-১০ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে এই খাতে।

সুত্রঃ কালের কন্ঠ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin