‘প্রতিপক্ষের’ সাথে দ্বন্দ্ব ও ‘প্রতিযোগীর’ সাথে বিবাদ এক কথা নয়

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

রাজনীতিতে যেভাবে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব, সংঘাত, সংঘর্ষ চলছে তাতে বিচলিত ও আতঙ্কিত নন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু দেশের ভেতরের ও বাইরের একটি বিশেষ মহল এতে বিচলিত তো নয়ই, বরং তাতে তুষ্ট। এই মহলটি এদেশে সংঘাত-সংঘর্ষের পরিস্থিতি জিইয়ে রাখতে আগ্রহী। সেটিই তাদের বৃহত্তর নীল নকশার অংশ। অর্থনৈতিক শোষণের স্বার্থে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থে মহলটি এদেশকে ‘নিয়ন্ত্রিত নৈরাজ্যের’ পরিস্থিতির মাঝে আটকে রাখতে চায়।

এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠী ব্যতীত প্রতিটি মানুষের আন্তরিক কামনা হলো— দেশ স্থায়ীভাবে সংঘাত-সংঘর্ষ মুক্ত হোক। কিন্তু দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, ক্ষমতার হাতবদল হয়— অথচ তাদের সেই কামনা পূর্ণ হয় না। কেন? যেসব দ্বন্দ্ব, সংঘাত, সংঘর্ষ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে তা কেন দূর হচ্ছে না সে রহস্যের কিনারা করতে হলে চলমান দ্বন্দ্ব, সংঘাত, সংঘর্ষের স্বরূপটিকে বুঝতে পারা একান্ত আবশ্যক। দ্বন্দ্ব, সংঘাত, সংঘর্ষের মাত্রা ও রূপটি কি তা যেমন দেখার বিষয়, তার চরিত্র ও ভিত্তিটি কি সেটি বিবেচনায় নেয়াটা সেজন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে এখন নানা প্রকারের দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে। এক ধরনের সংঘাত চলছে কারখানার মালিকদের সাথে শ্রমিকদের, সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানির সাথে সর্বস্তরের দেশবাসীর, শেয়ার বাজারের মাফিয়াচক্রের সাথে সাধারণ ক্ষুদে বিনিয়োগকারীর, খুনী-ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের, সুন্দরবন ধ্বংস করার পাঁয়তারার বিরুদ্ধে সচেতন দেশবাসীর ইত্যাদি। অন্যদিকে, আরেক ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতও চলছে।

চলছে টেন্ডারবাজ-চাঁদাবাজদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে রক্তাক্ত সংঘাত, লুটপাটের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সংঘাত, এক মিল-মালিকের বাজার নষ্ট করার জন্য তার প্রতিযোগী অপর মালিকের পরিচালিত অন্তর্ঘাত, প্রমোশনের জন্য দলীয় প্রভাব প্রয়োগের প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে সংঘাত, পরবর্তী পাঁচ বছর রাষ্ট্রক্ষমতার সুযোগ ব্যবহার করে কোন্ প্রতিযোগী রাজনৈতিক গোষ্ঠী লুটপাটের লাইসেন্স পাবে তা নিয়ে রক্তক্ষয়ী আত্মঘাতী মরিয়া সংঘাত-সংঘর্ষ ইত্যাদি। আমাদের দেশে বর্তমানে উল্লিখিত প্রথম ধরনের চেয়ে দ্বিতীয় ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতই প্রধান।

দেশ ও দেশবাসীকে তা অসহায় আতঙ্কের মাঝে নিপতিত করে রেখেছে। ঝগড়া, দ্বন্দ্ব, সংঘাত উল্লিখিত দু’প্রকারেরই হতে পারে। দ্বন্দ্ব-বিবাদ ঘটতে পারে পরস্পরবিরোধী ‘বৈরী প্রতিপক্ষের’ মধ্যে। এই বিবাদ যেই রূপই গ্রহণ করুক না কেন, তার চরিত্র ও উত্স হলো মৌলিক ধরনের। যেমন কিনা গৃহস্থ ও ডাকাতের মধ্যকার বিবাদ। এক্ষেত্রে দু’পক্ষের স্বার্থ হলো মৌলিকভাবে পরস্পরবিরোধী। এখানে দু’পক্ষের মধ্যে কোনো সমস্বার্থের উপাদান নেই, সবটাই বিরোধাত্মক। একইভাবে মালিক ও শ্রমিকের স্বার্থ, সাম্রাজ্যবাদ ও জাতীয় মুক্তির স্বার্থ, লুটেরা ধনিক ও আপামর জনগণের স্বার্থ— এগুলোও মৌলিকভাবে পরস্পরের বৈরী। অন্যদিকে দ্বন্দ্ব-বিবাদ ঘটতে পারে পরস্পর ‘প্রতিযোগী’ একই পক্ষের শরিকদের মধ্যেও। ডাকাত গৃহস্থের ঘরবাড়ি থেকে তার সম্পদ লুটে নেয়।

কিন্তু সেই লুটের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ডাকাত দলের সদস্যদের মধ্যে খুনোখুনির ঘটনা ঘটাটাও অসম্ভব না। অথবা গৃহস্থের উত্তরাধিকারদের মধ্যে সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে চরম বিবাদ সৃষ্টি হওয়াও অসম্ভব নয়। এ ধরনের দ্বন্দ্ব-বিবাদ ‘প্রতিপক্ষের’ মধ্যে ঘটে না, তা ঘটে একই পক্ষের ‘প্রতিযোগী’ শরিকদের মধ্যে। প্রতিযোগী শরিকদের মধ্যে এ ধরনের বিবাদের চরিত্র ও উত্স হলো অমৌলিক। শেয়ার বাজারের মাফিয়াদের মধ্যে কোন্ গ্রুপ অন্য কাকে ঠকিয়ে কোণঠাসা করবে, কিংবা ছাত্রলীগের বা ছাত্রদলের মাস্তানবাহিনী ও যুবলীগের যুবদলের মাস্তানবাহিনীর মধ্যে কারা টেন্ডার দখল কিংবা কমিশনের টাকা হাত করবে ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিবাদও একই প্রকারের অমৌলিক দ্বন্দ্ব থেকে উত্সারিত।

ফলে দেখা যায় এসব দ্বন্দ্ব-বিবাদে গোলাগুলি-হত্যাকাণ্ড যেমন ঘটে, তেমনি আবার আপোষে ‘সিক্সটি-ফরটি’ ভাগ-বাটোয়ারার ফর্মুলাতে দ্বন্দ্বের ফয়সালাও হয়ে যায়। এসব বিবাদ মূলত ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিবাদ। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের চরিত্র ও উত্স মৌলিক ও অমৌলিক এমন দু’ধরনের হলেও কোন্ ক্ষেত্রে যে এসব সংঘর্ষ-বিবাদের রূপ ও মাত্রা কোন্ পর্যায়ে যেয়ে উপনীত হবে তা একটি ভিন্ন বিষয়। এই রূপ ও মাত্রা দ্বন্দ্বের মৌলিকত্ব বা অমৌলিকত্বের ওপর নির্ভর করে না।

শোষক ও শোষিত শ্রেণির মধ্যে বিবাদটি যদিও মৌলিক, কিন্তু আমাদের দেশের সেই বিবাদ এখনো রাজনীতির দৃশ্যপটের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে যে সংঘাত-সংঘর্ষ প্রধান হয়ে দেশবাসীকে বিচলিত করে চলেছে তা হলো শোষক শ্রেণির বিভিন্ন ‘প্রতিযোগী দলগত গোষ্ঠীর’ মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার বিবাদ। দেশের প্রধান ও বড় দু’টি বুর্জোয়া দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যে বিবাদ, বর্তমানে তার মূল চরিত্র ও উত্স হলো সেটি।আমাদের দেশে যেসব রাজনৈতিক দল ও শক্তি ক্রিয়াশীল রয়েছে তাদেরকে সাধারণত ‘সরকারি শিবিরের দল’ ও ‘বিরোধী শিবিরের দল’— এই দুই মোটা দাগে চিহ্নিত করার প্রবণতাই বেশি দেখা যায়। কিন্তু রাজনৈতিক দলের বিভাজনকে এভাবে স্রেফ সরকারি পক্ষ ও বিরোধী পক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করে বিভাজনের কাজটি সেরে ফেলা যথার্থ নয়।

অনুসৃত আদর্শ ও কর্মসূচির ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলের চরিত্র নির্ধারিত হয় এবং সে মোতাবেক রাজনৈতিক দল ও শক্তির বিভাজনকে চিহ্নিত করাটাই সঠিক। এই বিবেচনা থেকে দেশের সব রাজনৈতিক দল ও শক্তিকে মোটা দাগে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে রয়েছে যেসব দল যারা দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার কাঠামোকে বহাল রেখে চলতে চায়। এসব দলকে মধ্যপন্থি, রক্ষণশীল ইত্যাদি রূপেও আখ্যায়িত করা হয়। এ ধরনের দল হলো আওয়ামী লীগ, বিএনপি, গণফোরাম, জাতীয় পার্টি ইত্যাদি। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে সেসব দল যারা প্রচলিত অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থা বদল করে তাকে আরো পেছন দিকে, তথা মধ্যযুগীয় ধারার দিকে নিয়ে যেতে চায়।

এদেরকে প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ দল বলেও চিত্রায়িত করা হয়। এ ধরনের দল হলো জামায়াতে ইসলাম, জাতীয় পার্টি, হেফাজতে ইসলাম ইত্যাদি। তৃতীয় ভাগে রয়েছে সেসব দল যারা প্রচলিত অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে তাকে প্রগতিমুখীন সম্মুখ দিকে নিয়ে যেতে চায়। এসব দল প্রগতিশীল, বামপন্থি, কমিউনিস্ট শক্তি বলেও পরিচয় বহন করে। কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, ন্যাপ ইত্যাদি হলো এ ধরনের দল। এভাবে আখ্যায়িত হওয়া ছাড়াও রাজনৈতিক দল ও শক্তির আদর্শ ও কর্মসূচিগত তুলনামূলক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরকে বামপন্থি, মধ্যপন্থি ও ডানপন্থি হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। এভাবে চিহ্নিত করার পেছনেও যথেষ্ট যৌক্তিকতা আছে।

তবে সব দলকেই সোজা-সাপটাভাবে এই তিন ভাগের মধ্যে একটি রূপে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করা যায় না। একই দলের মধ্যে কখনো কখনো দুই প্রবণতার উপাদান পরিলক্ষিত হয়। তাছাড়া, সময়ের সাথে সাথে অনেক সময় একই দলের চরিত্রেরও পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে তিনটি দ্বন্দ্ব হলো মৌলিক। একটি হলো সাম্রাজ্যবাদের সাথে গোটা জাতির স্বার্থের দ্বন্দ্ব। অপরটি হলো সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর পরগাছাসম মুত্সুদ্দি লুটেরা পুঁজির সাথে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষ-মধ্যবিত্ত-উত্পাদনশীল উদ্যোক্তা শ্রেণির দ্বন্দ্ব। মৌলিক দ্বন্দ্বের তৃতীয় বিষয়টি হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী শক্তির সাথে অসাম্প্রদায়িক-মানবতাবাদী-গণতান্ত্রিক জনগণের দ্বন্দ্ব। সাম্রাজ্যবাদ, লুটপাটতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ— এই তিনটি শক্তিই হলো বর্তমানে দেশ, জাতি ও জনগণের প্রধান শত্রু তথা মূল প্রতিপক্ষ। এই মূল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইকে খণ্ডিত করা সম্ভব না।

এই তিন শত্রু যেহেতু একটি অপরটির অবিচ্ছেদ্য পরিপূরক তাই তাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে একসাথে। দেশের কমিউনিস্ট, বামপন্থি ও প্রগতিবাদী দল ও শক্তি এই মৌলিক বিরোধের নিষ্পত্তির জন্য তিন শত্রুর বিরুদ্ধে নীতিনিষ্ঠ লড়াইয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী। অন্যান্য দল (বামপন্থি বলে দাবিদার কিছু বিভ্রান্ত বামপন্থি দলসহ) এই তিন শত্রুর বিরুদ্ধে একসাথে লড়াই করতে অক্ষম। ডানপন্থি দলগুলোর ক্ষেত্রে সে ধরনের লড়াই করার প্রশ্নের অবকাশই নেই। মধ্যপন্থি দলগুলোর কেউ কেউ কোনো কোনো সময় নিজেদের দলীয় স্বার্থে তিন শত্রুর কোনটির সাথে সাময়িক বিরোধে লিপ্ত হলেও সাধারণভাবে তারা এই বৈরী প্রতিপক্ষের স্বার্থ রক্ষা করেই চলে। সাম্রাজ্যবাদ ও লুটপাটতন্ত্রের ক্ষেত্রে জামায়াত প্রভৃতি প্রতিক্রিয়াশীল দলতো বটেই, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিও প্রায় পরিপূর্ণ নতজানু। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ‘সমমনা’ দল বলে চিহ্নিত করা মোটেও ভুল হবে না। স্বাধীনতাবিরোধী উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গি শক্তির সাথে বিবাদের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থানের মধ্যে কিছু তারতম্য রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের রয়েছে দোদুল্যমানতা। রাষ্ট্র ক্ষমতার আশু প্রয়োজনের বিবেচনা থেকে তারা সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সাথে আপস করতে পিছপা হয় না।

সংবিধানে ‘রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম’-এর বিধান রেখে দেয়া, একসময় জামায়াতের সাথে ‘কৌশলগত ঐক্য’ করা, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সাথে ঘৃণ্য ৫ দফা চুক্তি করা ইত্যাদি নানা ঘটনায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে বিএনপি এসব শত্রু শক্তিকে আগাগোড়াই মদদ ও আশ্রয় দিয়ে চলেছে। অবস্থা প্রায় এমন হয়েছে যে, বিএনপির রাজনীতি এখন বহুলাংশে জামায়াত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে যে, তিন শত্রু তথা সাম্রাজ্যবাদ, লুটপাটতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বই যেখানে কি না বর্তমানে মৌলিক বিরোধ, সেখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান হলো সাধারণভাবে শত্রুপক্ষের দিকে। অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার বিষয়ে যদি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ‘সমমনা’ দল হয়, তিন শত্রুর প্রশ্নে যদি তাদের উভয়ের অবস্থান একদিকেই হয়, তাহলে মৌলিক ইস্যুতে এই দুই দলের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ ঘটার কোনো কারণ নেই।

তথাপি, এই দু’দল মিলে দেশের রাজনীতিকে আজ সংঘাত-সংঘর্ষ, অনিশ্চয়তা, নৈরাজ্য ও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নিক্ষেপ করেছে। প্রশ্ন হলো, মৌলিক ইস্যুতে দু’দলের মধ্যে তেমন একটা দ্বন্দ্ব-বিবাদ না থাকা সত্ত্বেও এই হানাহানির উত্স কি? দেশের দু’টি বড় বুর্জোয়া দলের মধ্যে যে হানাহানি চলছে তার উত্স ‘প্রতিপক্ষরূপে’ মৌলিক ইস্যুতে দ্বন্দ্ব-সংঘাত নয়। তার প্রধান উত্স হলো ‘প্রতিযোগী’ হিসেবে শরিকী বিবাদ। এই বিবাদ হলো মূলত লুটপাটের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ঝগড়া ‘দুই কুকুরের লড়াই’ নয় ঠিকই এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ‘এক পাল্লায় মাপা’ সঠিক হবে না ঠিকই (যেমন কিনা বিএনপি ও জামায়াতকে একই পাল্লায় মাপাটাও ঠিক নয়)। কিন্তু মোটা দাগে আর্থ-সামাজিক নীতি-দর্শনের ক্ষেত্রে তাদেরকে সমমনা বা একই শিবিরভুক্ত বলাটাও ভুল হবে না। সেই শিবির হলো লুটপাটতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের শিবির। এসব দলের কাছে নীতি-আদর্শের চেয়ে ক্ষমতায় যেতে পারাটাই হলো তাদের উভয়ের প্রধান দলীয় লক্ষ্য। ক্ষমতায় যেতে পারাটা লুটপাটের রাজ্যে গোষ্ঠীগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যাবশ্যক। সেটাই তাদের ক্ষমতার লোভের মূল প্রণোদনা।

পক্ষান্তরে, আদর্শবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রে আদর্শ-কর্মসূচি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠাই হলো লক্ষ্য। রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জন হলো সেই লক্ষ্য পূরণের একটি মাধ্যম। ক্ষমতায় থাকা বা না থাকা উভয় পরিস্থিতিতে দেশ ও জনগণের কল্যাণ সাধনই হলো আদর্শবাদী রাজনীতির মূল সাধনা। কিন্তু বিএনপি, আওয়ামী লীগ প্রভৃতি দলের ক্ষেত্রে ক্ষমতায় যেতে পারাটাই হয়ে উঠেছে মূল সাধনা। দেশ ও জনগণের পক্ষে কথা বলা ও কাজ করার বিষয়টি হচ্ছে ক্ষমতায় যাওয়ার সেই মূল লক্ষ্য অর্জনের পথে ‘কৌশলগত’ উপায়সমূহের একটি মাত্র। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যখন ক্ষমতায় যায় তখন তারা দেশ ও জনগণের স্বার্থের কথা ভুলে লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

কিন্তু এ দু’টি দল যখন ক্ষমতার বাইরে থাকে তখন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পথ তৈরি করার উদ্দেশ্যে দেশ ও জনগণের স্বার্থের স্বপক্ষে তারা অনেক কথা বলে। অবস্থা যদি তাই হয় তাহলে দেশ ও জনগণের স্বার্থ হাসিলের জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলেরই সর্বদা ক্ষমতার বাইরে থাকাটা দেশ ও জনগণের জন্য কল্যাণকর হবে না কি? তবে, দেশের রাজনীতিতে তা কল্যাণকর হয়ে উঠতে পারে তখনই যখন দেখা যাবে যে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিকল্প আদর্শবাদী রাজনৈতিক শক্তির অভ্যুদয় ঘটেছে। অরাজনৈতিক বা রাজনীতি-বিরোধী কোনো ফর্মুলা সমাধান দিতে পারবে না।

সেরূপ উপযুক্ত রাজনৈতিক বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার কর্তব্যই এখন দেশের সামনে প্রধান একটি আবশ্যক কর্তব্য। যতোদিন এই কর্তব্য পালন সম্পন্ন হবে না ততোদিন দেশ ও জনগণের ‘প্রতিপক্ষ’ বৈরী তিন শত্রুকে মোকাবেলা করে এগিয়ে যাওয়ার বদলে দেশে অব্যাহত থাকবে সাম্রাজ্যবাদ, লুটপাটতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িকতার মনতুষ্টি করে লুটপাটের সুযোগ পাওয়ার জন্য ক্ষমতায় যাওয়ার কুৎসিত ‘প্রতিযোগিতা’।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin