পুরান লড়াই নতুন করে শুরু করতে চাই

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

আর রাজী

মানুষকে যেই সব কারণ দেখিয়ে দমিয়ে রাখা হয়, বঞ্চিত করা হয়, সম্ভবত সে সবের প্রধানতমটি হচ্ছে ‘ভাষা’। যে ভাষা নিয়ে একজন মানুষ জন্মায় সেই ভাষাকেই তার বিরুদ্ধে বঞ্চনার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা হয়। এই কথাগুলো আমাদের খুব জানা। জানা বলেই, ভাষার কারণে যেন বঞ্চিত না হতে হয় সেই লড়াইয়ে জীবন দিয়েছেন আমাদের পূর্বপুরুষরা।

কিন্তু রক্ত দিয়ে আপনি যা কিছুই অর্জন করেন না কেন, সেই অর্জনকে নস্যাৎ করে দিতে, অধিকারকে ছলে বলে কলে কৌশলে কেড়ে নিতে জুলুমবাজ বদগুলোর শয়তানিতে বিরতি পড়ে না। বাংলার মানুষের জীবন সেই শয়াতানির পাকেই খাবি খাচ্ছে শত শত বছর ধরে। এই দেশটার সবচে বেশি মানুষের ভাষা বাংলা। সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষা বাংলা।

কিন্তু কখনো সংস্কৃতর নামে, কখনো আরবী-ফার্সি-ইংরেজি-উর্দুর নামে বাংলাভাষী মানুষকে বঞ্চিত করা হয়েছে তার অধিকার থেকে। আজ এতো বছর পরে, ইংরেজির নামে অব্যহত রাখা হয়েছে সেই বঞ্চনা। কী বিস্ময়কর দেখেন, এই দেশের ইউনিভার্সিটিগুলো যারা চালায় তারা কতোটা বদমাইশ, এখনও পর্যন্ত, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও তারা ইংরেজির পরীক্ষা নিয়ে ছাত্র ভর্তি করে। অথচ এই দেশে সকল পর্যায়ে শিক্ষকদের কেবল তখনই নিয়োগ পাওয়ার কথা, যখন সে তার সব রকম কাজ, পাঠদান, লেখালেখি বাংলায় করতে সক্ষম। যদি সে তা না পারে তাহলে সে নিয়োগ পাওয়ার অযোগ্য।

বাংলা ভাষায় যে পড়াতে পারে না, নিবন্ধ বা বইপত্র লিখতে পারে না সে কোন আক্কেলে এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে আসে! আর তাকে নিয়োগই বা কেন দেওয়া হয়? এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থানীয় ভাষাভাষীদের দখলে না নেয়া গেলে ভাষার নামে সাধারণ মানুষের সন্তানদের বঞ্চনার অবসান অত্যন্ত দুরূহ। দেখেন, আপনার আমার টাকায় এই দেশের ইউনিভার্সিটিগুলো চলে। অথচ আপনার আমার সন্তান এই দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাল ভাল বিষয়গুলোতে ভর্তি হতেই পারে না, ভর্তি হতে পারলেও ভাল ফলাফল করতে পারে না।

এর অন্যতম কারণ, টিচারদের ইংরেজি ভাষাপ্রীতি। ইংরেজি ভাষার নামে ভয়ঙ্কর এক বৈষম্য জারি রেখেছে ইউনিগুলো। অথচ বাংলাভাষায় পাঠদান, বাংলাভাষায় যথেষ্ট বইপত্র না লেখা, বাংলায় বিশ্বজ্ঞান অনুবাদ করতে না পারার কারণে এই সব বিভাগের টিচারদের চাকুরি থেকে বিদায় করে দেওয়া উচিত আমাদের। বাংলাভাষায় দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ টিচাররা নির্লজ্জের মতো আমার সন্তানের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা যাচাই করে- এই প্রক্রিয়ার অবসান হওয়া উচিত এখনই। আপনি নিশ্চিত জানেন, আপনি যদি স্বভাষায় বিদ্যা চর্চা না করতে পারেন, তাহলে আপনি আদতে কিছুই শেখেন না।

আপনি আহাম্মকের মতো কেবল কিছু সনদ বয়ে বেড়ান। সুতরাং যে বইবলদ টিচাররা আপনাকে আপনার ভাষায় শিক্ষা দিতে পারেন না, তার কোনো যোগ্যতা নাই আপনার পকেট কেটে মাসে মাসে মাইনে নেওয়ার। এই দেশে শোষক আর শাসকশ্রেণীর অনেক দালাল এই টিচারদের মধ্যে রয়েছে, যারা নানান মধুর বাজে কথা বলে বাংলাভাষায় শিক্ষাদানের বিরোধিতা করে। নিজের বাংলা না পারার অযোগ্যতাকে আড়াল করতে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাদান সম্পর্কে নিরন্তর মিথ্যা বলে, মিথ্যা অহমিকা প্রচার করে।

এই দেশটা যাদের, এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে হবে তাদের সন্তানদের ভাষায়। যে যত বড় পণ্ডিতই হোক না কেন, উনি কি এমন কোনো ভাষায় পাঠদান করতে পারবেন, যে ভাষা তার ছাত্রদের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা নয়? আত্মমর্যাদাপূর্ণ কোনো দেশেই পারবেন না। কিন্তু বাংলাদেশে তাই চলছে এবং যুগ যুগ ধরে এই দেশের ইউনিগুলোর পেছনে ব্যয় করা অর্থ জলে যাচ্ছে। যার নিমক ইউনিভার্সিটির টিচাররা খেয়েছে, খাচ্ছে; তাদের সাথে হারামিপনা করে গেছে ও যাচ্ছে, ভয়ানক ঔদ্ধত্যের সাথে। এই জনবিরোধী ইউনিভার্সিটিগুলো তাদের পাঠ্যসূচীগুলো পর্যন্ত বাংলা করতে পারেনি বা করতে চায়নি! ইউনিভার্সিটিগুলোতে বাংলা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি বলেই এই দেশের উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো, বলা চলে সকল ক্ষমতা চর্চা কেন্দ্রে ইংরেজি বহাল থেকে গেছে।

কি বিস্ময়কর, যাদের টাকায় আহার জোটে তাদের ভাষাতেই কথা বলে না তাদের উচ্চ আদালত! কি নির্মম রসিকতা- আমাদের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের নাম ইংরেজিতে- পিএটিসি! আমাদের এই রাষ্ট্রে অবশ্যই কিছু কিছু মানুষ থাকা দরকার যারা ইংরেজি, ফরাসি, চিনা, আরবি, রুশ, জাপানি, স্প্যানিশ, ফার্সি ইত্যাদি এক দুইটা ভাষা খুব ভালভাবে জানবে। সেই সব ভাষাভাষীর সাথে আমাদের যোগাযোগ রক্ষা করবে, সেই সব ভাষার জ্ঞান আমাদের বাংলায় অনুবাদ করে দেবে। উচ্চশিক্ষা যারা চর্চা করবে তাদের দু’ তিনটা ভাষায় ভাল দক্ষতা থাকাও দরকার।

কিন্তু কিছুতেই এই দেশের অধিকাংশ মানুষের ইংরেজি শেখার প্রয়োজন নাই। গত তিনশ বছরের চেষ্টাতে তা সম্ভবও হয়নি। তাহলে ইউনিগুলোতে কেন ইংরেজিভাষার প্রাধান্য থেকেছে? উত্তর একটাই, লেখাপড়ার নামে শোষক-শাসকের অনুকূলে বৈষম্য জারি রাখাই এর উদ্দেশ্য। এই দেশের ভাগ্য যদি আমরা ফেরাতে চাই, তাহলে অবশ্যই এই রাষ্ট্রে সাধারণের ভাষার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতেই হবে।

এই লক্ষ্যে নতুন করে লড়াই-সংগ্রামের কর্মসূচী নিতে হবে। সবার আগে হাত দিতে হবে ইউনিভার্সিটিগুলোতে। বাংলাভাষায় পাঠদান, বইপুস্তক নিবন্ধ-প্রবন্ধ লিখতে যারা অযোগ্য তাদের দ্রুত ইউনিগুলো থেকে বিদায় করে দিতে হবে। মনে রাখা দরকর, এরাই ভাষার নামে বৈষম্যকারীদের প্রধান ক্রীড়ানক। এরাই এই দেশের মানুষের অন্যতম প্রধান শত্রু।

লেখকঃ আর রাজী,সহকারি অধ্যাপক চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin