পরিবহন শ্রমিকদের করুণ অবস্থা, ‘পুলাপানের মুখে সেমাই দিতে পারমু না’

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

‘সবাই ভালো আছে, আমাগো দেখার কেউ নাই। একবার সরকার থেইকা ত্রাণ দিছিলো, এক ত্রাণ দিয়া কি আর সংসার চলে। তাও সবাই ত্রাণ পায় নাই। পোলা মাইয়ার পড়ালেখা বাদ দিয়া দিছি। বাড়ি ভাড়ার জন্য চাপ দিতেছে বাড়িওয়ালা, কয়, হান্ডি-পাতিল নিয়া বাইর হন, এই সুখে আছি আমরা বুঝলেন’।

এভাবেই ক্ষোভের কথা বলছিলেন পরিবহন শ্রমিক মো. রাজিব।

শুধু রাজিব নন, পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অনেকেই এরকম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। পকেটে নাই টাকা। বাসায় চাল নাই। কাজের ব্যস্ততা নাই। লকডাউনে সব গণপরিবহন বন্ধ থাকায় অসহায় অলস সময় পার করছেন পরিবহন শ্রমিকরা। দূরপাল্লা বাস শ্রমিকদের বর্তমান সময়ে এই দশা চোখে পরার মতো। গাড়ির চাকা ঘুরলেই ঘুরে তাদের জীবনের চাকা। প্রতিদিনের উপার্জনের টাকা দিয়েই চলত পুরো সংসার।

মধ্য বয়সী এক লোক ফুটপাতের কোনায় গালে হাত দিয়ে বসে ছিলেন, প্রতিবেদক জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, কি বলবো ভাই, আমাদের আর অবস্থা। বাসে হেলপারি করি। দিন আনি দিন খাই। এখন তো আমাগো গাড়ি চলে না। কিভাবে যে প্রত্যেকদিন (প্রতিদিন) সংসারটা চলে আল্লাহ জানে আর আমি জানি। ঈদে পুলাপানের মুখে সেমাই দিতে পারমু না। গত বছর ফতুল্লা থানা থেকে একটা সিলিপ পাইছিলাম ত্রাণের, ত্রাণ নিতে গিয়া হুনি(শুনি) ত্রাণ নাকি শেষ পরে দিবো। পকেট থেকে বের করে সেই ত্রাণের জন্য পাওয়া টোকেন দেখান তিনি। এক বছর পার হয়ে গেলেও এখনো সেই ত্রাণের আশায় নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন টোকেনটি।

গণপরিবহন বন্ধ থাকায় অসহায় হয়ে পরেছেন ওয়ার্কশপ গুলোতে থাকা মালিক ও কর্মচারীরা। গাড়ি চাকা না ঘুরলে তাদের রোজগার বন্ধ থাকে। গণপরিবহন চললে তাদের রোজকার ইনকাম দিয়ে কর্মচারির বেতন ও পরিবার চালায়। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বর্তমানে তাদের অবস্থা খুব নাজেহাল।

ইাঞ্জিনমিস্ত্রি দিপংকর হালদার জানান, আমাদের কোনো কাজই নাই, বড় গাড়ি না চল্ললে আমগো কোনো কাম থাকে না। আমরা এখন ধার দেনা কইরা চলতাছি। আমার দোকানে একটা কর্মচারি কাম করে। ওরে আসতে নিষেধ করে দিছি। ও আইস্যা কি করবো। ওরে রোজের টেকা কইত্তে (কোথায়ে থেকে) দিবো।

বড় গাড়ির চাকা মেরামত করান নাজমুল মিয়া কিন্তু গত প্রায় দেড় মাসের লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সংকট তার পিছুও ছাড়েনি তিনিও ব্যাক্ত করলেন বর্তমান অবস্থার কথা। তিনি বলেন, ‘কোনোদিন খাইয়া থাকি কোনোদিন না খাইয়া, বাসায় সন্তান আছে তাগোরে (তাদের) তো খাওয়াই রাখতে পারি না। ওদের তো আর কোনো দোষ নাই যে, ওর বাপ কিছু করতে পারে না, ওদের ঠিক মতো খাওয়ন দিতে পারে না।’- কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলছিলেন নাজমুল মিয়া।

গণপরিবহনে বেতনভুক্ত কর্মচারির থেকে রোজ পারিশ্রমিক নেয়ার সংখ্যা বেশী, আনন্দ পরিবহনের হেলপার মো. মামুন জানান, আমাদের তো কোনো বেতন নাই। গাড়ি চললে আমাদের সংসার চলে। অনেক মানুষের কাছে থেকে ধার দেনা করে চলতে হইতাছে। এখন এই পরিস্থিতিতে কেউ ধারও দিতে চায় না। আমরা তো কোনোদিন পড়াশোনা করি নাই, ইচ্ছা ছিলো ছোট মেয়েটাকে পড়াশোনা করাবো। গত মাসে মেয়ের টিউশন বন্ধ করে দিয়েছি। এই অবস্থায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। মেয়ের পড়াশোনা কিভাবে করাবো।

এদিকে, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় আয় কমে গেছে বিভিন্ন তেলের পাম্প গুলোতে, সেখানেও কোনো গাড়ি আসে না তেল নিতে। যার ফলে বেতন ভুক্ত হওয়ার পরেও, মাস শেষে সম্পূর্ণ বেতন পাচ্ছে না তেলের পাম্পে কাজ করা কর্মচারীরা। কতৃপক্ষের দাবি ‘গণপরিবহন বন্ধ থাকায় বিক্রি কমে গেছে, তাই সম্পূর্ণ বেতন দিতে পারছে না তারা। কর্মচারীদের কিছুটা বেতন দিয়ে আপাতত চালাচ্ছে তেলের পাম্প। এভাবে যদি গাড়ির চাকা বন্ধ থাকে তাহলে ফিলিং স্টেশন বন্ধ করে, পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

বঙ্গবন্ধু সড়কের ‘মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারে’র ক্যাশিয়ার নাজমুল হোসেন জানান, আমাদের রেগুলার ডিউটি টাইম অনুযায়ী আমারা ডিউটি করছি। মাস শেষে বেতন সম্পূর্ণ পাচ্ছি না। মালিকপক্ষই বা কি করবে, তাদেরও তেমন সেল নেই। এই অবস্থায় কোনো রকম সংসার চালাচ্ছি। কোনো রকম ডাল ভাত খেয়ে বেচেঁ আছি। আমরা এখনো কোনো সরকারি ত্রাণ বা কোনো সরকারি অনুদানের টাকা পাইনি। আমাদের খবর নেয়ার মতো কেউ নাই।

বঙ্গবন্ধু সড়কের অপর আকেটি তেলের পাম্প ‘প্রান্তিক সার্ভিস স্টেশনের ম্যানেজার বিল্লাল হোসেনের সাথে কথা বললে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, আমাদের তেলের পাম্প শহরের একেবারে শীর্ষ প্রান্তে, আমরা লকডাউন মানি এবং আমরা চাই লকডাউন হোক, লকডাউনের কারণে যদি সংক্রমণ কমে মানুষের মৃত্যু কমে যায়। তাহলে আমরা লকডাউন চাই। কিন্তু আমাদের তো না খেয়ে মরতে হবে এই পরিস্থিতিতে। যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চালু করে। তাহলে আমরাও চলতে পারবো, মানুষও যুকিমুক্ত থাকবে।

সুত্রঃ লাইভ নারায়ণগঞ্জ।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin