নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ঐক্য হয় না যে কারণে

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

নারায়ণগঞ্জ শহরে রাজনৈতিক ঐক্যের কথা কথা ফিরছে মানুষের মুখে মুখে। এটাই এখন টক অব দ্যা নারায়ণগঞ্জ। রাজনীতির চর্চা করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, উন্নয়নের স্বার্থেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ঐক্য জরুরী। কেননা নানান ঘাত-প্রতিঘাত ও দ্বন্দ্ব সংঘাত পেরিয়ে রাজনীতিতে একটা পরিপক্কতা বিরাজ করছে। এর সাথে জড়িত সকলেরই মূল্যায়ন পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। কেউ পুরোপুরি মূল্যায়ন পেয়েছেন। যোগ্যতার তুলনায় কারো সহনশীল মূল্যায়ন প্রাপ্তি ঘটেছে। কারো মূল্যায়ন হয়েছে অতি অল্প। তবে অবমূল্যায়নের হাহাকারটা কমেছে।

ওসমান পরিবারের দু’ভাই বর্তমান এমপি। চুনকা পরিবারে ডা. আইভী উপমন্ত্রীর মর্যাদায় সিটি মেয়র। জাপা’র লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

শহরের রাজনৈতিক নেতারা যোগ্যতা বিচারে সকলেই দলে পদ পদবী পেয়েছেন। বিএনপি নেতারা অভ্যন্তরীন কোন্দলের কারণে স্বেচ্ছায় একটু আড়ালে থাকেন। জাপা নেতাকর্মীরা চলনে বলনে আওয়ামীলীগের সমকক্ষ হয়ে আছেন। আপাতত: শহরে কোন উৎপাত নেই। সবার প্রাপ্তিযোগের সাথে শহরের উন্নয়ন কাজগুলোও চলমান। বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের এটাই মোক্ষম সময়। এই সময়ে একসাথে বসে ঐক্য গড়তে পারলে শহরের উন্নতি হবে। নারায়ণগঞ্জবাসীর চাওয়া পাওয়া পূরণ হবে।

রাজনৈতিক বোদ্ধামহলের মতে, এই শহরে যখনই বৃহত্তর ঐক্যের ডাক দেয়া হয় তখনি বড় নেতারা ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। এবং ঐক্য গড়তে এগিয়ে আসেন। সিনিয়র ও বিজ্ঞ নেতারা খুশি হন। তবে একটি মহল বরাবরই বৃহত্তর ঐক্যে ভয় পান। ওই মহলটি হচ্ছে সুবিদাবাধী মহল। ওরা সব সময় রামের কথা শামের কাছে এবং যদুর বদনাম কদুর বাড়িতে গিয়ে বলে আসতে অভ্যস্থ। অনেক নেতা সিনিয়র হলেও ইগো সমস্যার বাইরে যেতে পারেন না। ব্যস, কান পড়া শুনে তেতে উঠেন। মনে মনে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বীজ বপন করেন। একটা সময় রাজনৈতিক ঐক্যের কথা শুনলেই রেগে যান। অযথা কারো সমালোচনায় নেমে পড়েন। সুবিধাবাদি মহল এটাই সব সময় প্রত্যাশা করে। ওদের মনোভাব ও কাজের তরিকা হলো ঝগড়া লাগিয়ে দিয়ে ফায়দা লোটা।

সূত্রমতে, সুবিধাবাদি মহলটির শংকা বড়রা মিলে গেলে ওদের কাজ ফুরোবে। কাজ ফুরোলে বেকার হবে। বেকার হয়ে গেলে রাস্তায় নামতে হবে। এভাবে হাতপাতলে কেউ এক টাকাও দিবে না। অথচ বড় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ঝগড়া থাকলে ফায়দার শেষ নেই।

সুবিধাবাধীরা ইদানীং বিভিন্ন ব্লকের সাথে জড়িত। যারা মেয়র ব্লকের তারা সারাক্ষণ ওসমান পরিবারের বদনাম করে মেয়রের কাছে। কিম্বা মেয়রের ঘনিষ্ঠদের কাছে। ওসমান পরিবারের কে কবে মেয়রকে নিয়ে কি মন্তব্য করেছে-এসব নিয়েই ওদের দিনকাটে। এই কানপড়া লাগিয়েই ওদের রুটি রুজি। আসলে ওরা ধান্দাবাজি করেই জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। যারা ওসমান পরিবারের ব্লকের তারা সারাক্ষণ মেয়রের কথা নিয়েই পরচর্চায় লিপ্ত থাকেন। মেয়র কোথায় কিভাবে ওসমান পরিবারের কোন ভাইকে নিয়ে মন্তব্য করেছেন এসবই ওদের ধান্দাবাজির পুঁজি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আদৌ ওসমান পরিবার ও চুনকা পরিবারের কেউ কোন মন্তব্য করেছেন কিনা-তার হদিস থাকেনা অথচ সুবিধাবাধীরা সারাক্ষণ তাদের কানভারি করে থাকে। ওরা গোয়েবলসের চেয়ে বেশি বিপদজনক।

ওসমান পরিবারের চাটুকাররা সারাদিন কানের কাছে বলতে থাকে ‘ভাই আপনাকে নিয়ে কি যেন বলেছে। আমাগো অমুক কন্ট্রাক্টার শুনেছে।’ তখন একবার হলেও যে কোন বড়ভাই তা বিশ্বাস করবে।

অপরদিকে মেয়রের সামনে গিয়ে নয় তাঁর ভাইদের কাছেই যদি কোন চাটুকার গিয়ে বলে রিপন ভাই বা উজ্জ্বল ভাই জানেন, ম্যাডামরে নিয়া কি জানি কইছে। একবার হলেও চাটুকারের কথা ওরা কানে তুলবেই। এভাবেই কানকথা ছড়ায়। আসলে চাটুকাররা যখন কানপড়া দেয় তখন তাদের গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় দিলেই লেঠা চুকে যায়। এমনটা সচরাচর দেখা যায়না। তাই চাটুকারের দল আজো উভয় ব্লকের লেজ ধরে টিকে আছে। কেউবা ভাল পদ পদবী অর্জন করে নিয়েছেন।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, শহরের রাজনীতিতে পরগাছা চাটুকার ও সুবিধাবাদিদের দল তেলাপোকার মতই টিকে আছে। অনেক বরেণ্য ও কীর্তিমান রাজনীতিবিদ আজ নেই। রয়ে গেছে তাঁদের কীর্তি। অথচ নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের নি¤œস্তরের রাজনৈতিক কর্মীরা তোষামোদিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এঁরা নিজেদের বসন্ত দিনে ছিলেন অকর্মার ঢেকি! এখন পরিপক্ক চাটুকার। চাটুকারিতা করেই তাদের পেট চলে। এই চাটুকারদের জন্যই রাজনৈতিক অঙ্গনে ঐক্য হতে গিয়েও হয় না। ওরা নিজেদের স্বার্থে বিরোধ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালায়। কার কোন পয়েন্টে দুর্বলতা আছে সেই পয়েন্টেই খোঁচা মেরে ঐক্যের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেয় বার বার।

এদিকে সম্প্রতি এক টক শো অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিল নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ লাভলু বলেন, এমপি ও মেয়র এক টেবিলে বসার ব্যাপারে মাঝখানে একটি পক্ষ আছে যারা চায়না এক টেবিলে বসুক। যদি তারা এক টেবিলে বসে পরে ওনাদের (তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যভোগীদের) তো কোন কাজ থাকেনা। যেকারণে ওনারা এক টেবিলে বসতে দেয়না।

সম্প্রতি বেসরকারী টিভি চ্যানেল নাগরিক টিভির আধঘণ্টার গল্পে শামীম ওসমান বলেন, নারায়ণগঞ্জের কারো সঙ্গে আমার কোন দ্বন্দ্ব নাই। রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এক। কিছু কিছু ব্যক্তি আছে যারা প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে গালি দিচ্ছে, উৎখাতের চেষ্টা করছে, আগেও বলেছে এখনও বলছে তাদের আমি পছন্দ করি না। আমি যখন দেখি জামায়াতের বড় নেতা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে বক্তব্য দিচ্ছে যে কাকে কেন কোন ওখানে দেওয়া হয়েছে প্রটেক্ট দেওয়ার জন্য। এখন বেশী প্রবলেম। বেশী কে খারাপ ছিল গোলাম আজম নিজামী নাকি খন্দকার মোস্তাক। কারণ নিজামী জামায়াতকে তো আমরা চিহ্নিত করতে পারি। কিন্তু খন্দকার মোস্তাকেরা তো পেছনের দরজা খুলে দিয়েছিল। পেছনের দরজা খুলেছিল বলেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। সে হিসেবে আমার কাছে মোস্তাকেরা খারাপ। তাদের চিহ্নিত করতে হবে।

এর আগে করোনাকালীন সময়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রচারিত বাসভূমির আলোকিত প্রবাস নামে ফেসবুক লাইভে আইভীর বক্তব্যে উঠে আসে তাঁর বিগত দিনে মেয়র হওয়ার গল্প, এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে সম্পর্ক, শহরের হকার নিয়ে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা, বিভিন্ন টেন্ডার প্রক্রিয়া, রাজউকের জমি বিক্রি করা, নিজ বাবা প্রয়াত পৌর পিতা আলী আহাম্মদ চুনকাকে জামায়াত সখ্যতা বানানোর অপ্রপয়াস ইত্যাদি। প্রায় ঘণ্টাখানেকের ওই লাইভে দেওয়া আইভী বক্তব্য এখন টক অব দ্য টাউন।

সঞ্চালক আকিদুল ইসলাম অনুষ্ঠানের শুরুর দিকে এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে মতবিরোধ দ্বন্দ্বের ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন তুলেন।

জবাবে মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘এটাকে দ্বন্ধ বলা যাবে না। এটা তো হতেই পারে। আপনাদের একটি ঘরে যদি ৫টি ভাইবোন থাকে সেখানে কি দ্বিমত থাকতে পারে না? দুই ভাইয়ের মধ্যে দ্বিমত হয় না? একটা ব্যবসায়ী বিজনেসম্যান দুই ভাই আছে সেখানে কি সম্পত্তির ভাগাভাগি হয় না? ঝগড়াঝাটি ভাইয়ে ভাইয়ে হচ্ছে না? হয়তো সুতরাং এটা আলাদাভাবে দেখার কিছু নেই। যেহেতু আমরা রাজনীতি আমরা করি সেহেতু নেতৃত্বের একটি লড়াই থাকবেই, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবেই। কিন্তু সেই নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা কতটুকু স্বাভাবিক থাকে সেটা হলো দেখার ব্যাপার।’

আইভী বলেন, ‘এখন দেখতে হবে আমরা প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে আমরা কি অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামলাম ? আমরা কি ন্যায়ের পক্ষে প্রতিযোগিতা করছি? আমরা কি সাধারণ মানুষের জন্য প্রতিযোগিতা করছি? নাকি নিজেদের আখের গোছানোর জন্য করছি? নাকি নারায়ণগঞ্জকে নিজের রাজত্ব মনে করে নিজেরে পকেটে নেওয়ার জন্য করছি? সেটা একটা দেখার বিষয়।’

‘তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের নাম নিলে শামীম ভাইয়ের নামটা আমার সঙ্গে চলে আসে এ করণে যে, আমি ২০১১ সালে ওনার সঙ্গে নির্বাচন করেছিলাম বলেই হয়তো এ বিষয়টা বেশি করে প্রকাশ পেয়েছে। এনিওয়ে, আমরা একই দল করি। অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আদর্শের অনুসারী। সুতরাং শুধু যে ওনার আর আমার মধ্যে এরকম আছে তা না, আমি বলবো, বাংলাদেশের মধ্যে এমন কোন জেলা নেই যেখানে বড়গুলোর মধ্যে সম্পর্কের একটু টানাপোড়েন থাকে না। আবার দেখেন, ক্রাইসিস মোমেন্টে কিন্তু সেই টানাপোড়েনগুলো থাকে না। মনে করেন, আজকে যদি যেকোন ক্রাইসি দেখা দেয় আমার কিংবা আমার দলের যেকারো হোক, ব্যক্তিগত ভাবে যদি শামীম ওসমানের হলো বা আমারও হলো বা যেটাই হলো আমরা কিন্তু দলগত ভাবে কেউ বসে থাকতে পারবো না। তখন আমরা সবাই একই সুরে দলের পক্ষে বা নেত্রীর পক্ষে কথা বলবো। কিন্তু সেটা এক জিনিস। সেটা দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে।’

নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা এবার সুবিধাভোগী মহলটি কল্কে পাবে না। বৃহত্তর ঐক্য হবে। উন্নয়নের জোয়ারে ভাসবে নারায়ণগঞ্জ। যেখানে কোন ব্লকের রাজনীতি থাকবেনা।

সূত্রঃনিউজ নারায়ণগঞ্জ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin