নারায়ণগঞ্জের যত ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

নারায়ণগঞ্জ জেলা অতি প্রাচীন ইতিহাসে সমৃদ্ধ ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট জেলা। বাংলাদেশের অতীত ঐতিহ্য মসলিন কাপড়ের সুনাম নিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে অবস্থিত এই নারায়ণগঞ্জ জেলা সোনালী আঁশ পাটের জন্যও বিখ্যাত। নারায়ণগঞ্জ জেলার দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ সোনারগাঁও লোক ও কারু শিল্প যাদুঘর, পানাম নগর, জিন্দা পার্ক, মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি, বালিয়া পড়া জমিদার বাড়ি, গোয়ালদী মসজিদ, হাজীগঞ্জ দুর্গ,সাতগ্রাম জমিদার বাড়ি, বারদী লোকনাথ আশ্রম, মেরি এন্ডারসন, ফুলের গ্রাম সাবদি, মায়াদ্বীপ, কাইকারটেক হাট সদাসদী জমিদার বাড়ি, চৌদ্দার চর ইত্যাদি। সোনারগাঁও- সোনারগাঁও নারায়ণগঞ্জ জেলায় কয়েকটি স্থাপত্য ও দর্শনীয় স্থানের জন্য যেমন বিখ্যাত, তেমনই রয়েছে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য।

কদম রসূল দরগাহ

বিশেষত সোনারগাঁও লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর , পানাম নগর, সম্রাট শাহজাহানের আগ্রায় নির্মিত তাজমহলের আদলে বাংলার তাজমহল সহ আরও অনেক কিছুই। পানাম নগর – পানাম নগর পৃথিবীর প্রায় ১০০ টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি যা আমাদের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও-এ অবস্থিত। পানাম বাংলার প্রাচীনতম শহরও বলা হয়। এখানে ছিল ইতিহাস বিখ্যাত ঢাকাই মসলিনের জমজমাট ব্যবসা।

তবে এখন আছে শুধু পুরনো মহল, মিনার এবং বাড়িগুলো। বারো ভুঁইয়া নেতা ঈসা খাঁ ‘র শাসনামলে পানাম নগর ছিল বাংলার রাজধানী । বড় নগর, খাস নগর এবং পানাম নগর -এই তিন নগরের মধ্যে পানাম নগরী ছিল সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছিল এই সমৃদ্ধ নগরী। পানাম নগরের দুই পাশে ঔপনিবেশিক আমলের মোট ৫২ টি স্থাপনা রয়েছে। এর উত্তরে ৩১ টি ও দক্ষিনে ২১ টি করে স্থাপনা অবস্থিত ।

মুরাপাড়া কলেজ

স্থাপত্যে ইউরোপীয় শিল্পরীতির সাথে মোঘল শিল্পরীতির মিশ্রন লক্ষ্যনীয়। নগরীর পানি সরবরাহের জন্য দু’পাশে পুকুর ও খাল রয়েছে। এছাড়া রয়েছে আবাসিক ভবন, উপাসনালয়, স্নানাগার, পান্থশালা এবং দরবার কক্ষ। আরও রয়েছে ছোট সর্দার বাড়ি, ঈশা খাঁর তোরণ, নীলকুঠি , বণিক বসতি, ঠাকুর বাড়ি, পানাম নগর সেতু ইত্যাদি। এখানে আরও রয়েছে চমৎকার লোক ও কারু শিল্প যাদুঘর সম্রাট শাহজাহানের প্রেমের সমাধি তাজমহলের আদলে নির্মিত হয়েছে বাংলার তাজমহল। সোনাকান্দা দূর্গঃ সোনাকান্দা দুর্গ মোঘল আমলে নির্মিত একটি জল দুর্গ। এটি ১৬৫০ সালে বাংলার তৎকালীন সুবেদার মীর জুমলা কর্তৃক নির্মিত হয়েছে বলে জানা যায়।

এটি নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলায় শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বতীরে অবস্থিত। হাজীগঞ্জ দুর্গঃ নারায়ণগঞ্জ জেলার হাজীগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে হাজীগঞ্জ দুর্গ অবস্থিত। এটিও নির্মান করেন সপ্তদশ শতাব্দীর বাংলার সুবেদার মীর জুমলা। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মোট তিনটি দুর্গ নির্মান করা হয়। সোনাকান্দা দুর্গ, হাজীগঞ্জ দুর্গ ও পার্শ্ববর্তী জেলা মুন্সিগঞ্জের ইদ্রাকপুর দুর্গ। তিনটি দুর্গের দুইটি দুর্গ (সোনাকান্দা দুর্গ ও হাজীগঞ্জ দুর্গ) নারায়ণগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। স্থাপত্য শিল্পের অসাধারণ শৈল্পিক ছোঁয়া লাগা এই দুর্গ দুটি দর্শনার্থীদের নজরে আকর্ষনীয় স্থাপত্য শিল্প। মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি, রূপগঞ্জঃ মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার অতি পরিচিত একটি স্থান।

পানাম সিটি

জমিদার রামরতন ব্যানার্জী ১৮৮৯ সালে ৪০ হেক্টর এলাকা নিয়ে জমিদার বাড়িটি নির্মান করেছেন বলে জানা যায়। তবে তিনি সম্পূর্ণ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার আগেই পরলোকগমন করায় তাঁর পুত্র প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জী চলতি বছরই তাঁর পুরনো বাড়ি ছেড়ে পেছনে আরও একটি প্রাসাদ নির্মান করেন। বিশাল এই জমিদার বাড়িতে সুনিপুণ শৈল্পিক কারুকার্য ছোঁয়ায় প্রায় শতাধিক কক্ষ রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে নাচঘর, কাছারিঘর, অতিথিশালা, পূজা মণ্ডপ, বৈঠকখানা, ভাঁড়ার ঘর সহ আরও অনেক স্থাপত্য শিল্পের অংশবিশেষ।

সোনাকান্দা দুর্গ

বর্তমান এই জমিদার বাড়ি মুড়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ হিসেবে ব্যাবহৃত হচ্ছে। বারদী লোকনাথ আশ্রমঃ নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার বারদী ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম অবস্থিত। লোকনাথ ব্রহ্মচারী এটি নির্মান করেছে বলে জানা যায়। আশ্রমটির ঠিক দক্ষিনে উঠোনে তাঁর সমাধিস্থলের পশ্চিমে, মুল গেটের ঠিক সামনে পথ আগলে শত বৎসর ধরে কালের নানা ঘটনার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাল আকৃতির এক বকুল বৃক্ষ। সে বৃক্ষে ফোটে হালকা মাটি রঙের ছোট ছোট সুগন্ধি ফুল। আশ্রমের ভেতরে বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী’র বিশালাকৃতির তৈলচিত্র। সকাল সন্ধ্যায় ভক্তরা এখানে পূজা করে,ভজন গায়।

এখানে বিনা পয়সায় যাত্রী নিবাস রয়েছে। দুর থেকে আগত ভক্তরা সেখানে বিনাখরচায় রাত যাপন করতে পারে। প্রতিবছর ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, এখানে সপ্তাহব্যাপী মেলা বসে। ১২৯৭ সালে এই মহাপুরুষের মৃত্যু ঘটে। তাঁর এই মহাকাল পরলোকগমন স্মরণেই ভক্তরা এই মেলা ও উৎসবমুখর পরিবেশের আয়োজন করে থাকে।

সোনারগাঁ জাদুগর

২। সদাসদী জমিদার বাড়িঃ সদাসদী জমিদার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার গোপালদী পৌরসভার সদাসদী গ্রামে অবস্থিত একটি প্রাচীন বাড়ি। আড়াইহাজার উপজেলা থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্বে, প্রায় ৬০ শতাংশ জমি নিয়ে এই ঐতিহাসিক বাড়িটি নির্মিত। মুল নাম গোপালদী জমিদার বাড়ি। ইতিহাস বলে, একসময় গোপালদীতে তিনজন জমিদার -সর্দার, তেলি এবং ভূঁইঞা প্রমুখ এই এলাকায় বসবাস করতেন ।

শ্রী প্রসন্ন কুমার সর্দার ছিলেন অত্র এলাকার সবচেয়ে বড় জমিদার। সর্দার বাড়ির দ্বিতীয় তলায় শৈল্পিক কারুকার্য দর্শনে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। গোপালদী জমিদার বাড়িটি ১৩২৩ বঙ্গাব্দে নির্মিত হয়। সুবিশাল এই জমিদার বাড়িতে ১০১ টি কক্ষ ছাড়াও চারদিকে কারুকার্য খচিত ৪ টি ভবন রয়েছে। প্রতিটি কক্ষের দরজা ও জানালায় রয়েছে সুনিপুণ শৈল্পিক কারুকার্যের ছোঁয়া। জিন্দা পার্কঃ জিন্দা পার্ক নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ১০০ বিঘা জমি জুড়ে গড়ে উঠেছে। পার্কে রয়েছে স্কুল, ক্লিনিক, নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী বিশিষ্ট লাইব্রেরি, মসজিদ, কবরস্থান ও অভিজাত রেস্তোরাঁ। এছাড়াও ২৫০ প্রজাতিরও অধিক গাছপালার সমন্বয়ে চমৎকার সুশীতল ছায়াতলে নির্মিত এই পার্ক।

পরিবেশের স্নিগ্ধতা তৈরিতে রয়েছে পাঁচটি সুবিশাল লেক। ফ্যামিলি পিকনিক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পিকনিকের জন্য পার্কটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। পার্কটি নির্মানে ১৯৮০ সালে প্রায় ৫০০০ হাজার সদস্য নিয়ে ‘ অগ্রপথিক পল্লী সমিতি ‘ পথচলা শুরু করে। প্রায় ৩৫ বছরের ঐক্যবদ্ধতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল নারায়ণগঞ্জের জিন্দা পার্ক। শহরের যানজট ও কোলাহলমুখর পরিবেশের একঘেয়ে জীবনে প্রায়ই প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে পারেন নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের জিন্দা পার্কে। জিন্দা পার্কে প্রবশের টিকিট প্রাপ্ত বয়স্কঃ ১০০ টাকা। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ৫০ টাকা। খাবার সহ প্রবেশ করলে টিকিট ১২৫ টাকা। লাইব্রেরি প্রবেশ ২৫ টাকা।

লেকে নৌকায় বেড়ানো ৩০ মিনিট ২০০ টাকা। চৌদ্দার চর আড়াইহাজারঃ চৌদ্দার চর নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় অবস্থিত একটি মনোরম দর্শনীয় স্থান। যাবার পথে পাবেন পথের দুই পাশে বিশাল পুকুর, কুল বাগান, আঁকাবাকা মেঠো পথ, ১২৫ বছরের পুরনো স্কুল, ১০৫ বছরের পরনো জমিদার বাড়ি এবং মেঘনা নদী তীরবর্তী ১০ থেকে ১২ টি চর। দেখা যাবে হরেক রকমের পাখি ও সাদা বক, শামুক-ঝিনুক। শতশত জাহাজ, হঠাৎ চোখে পড়বে রাজহাঁস। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের আদলে এই চরের সৌন্দর্য সকলকেই মুগ্ধ করে। মেরি এন্ডারসনঃ নারায়ণগঞ্জের পাগলা এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে ভাসমান রেস্তোরাঁ, গাছপালা ও শোভাবর্ধক বৃক্ষ লতার সমন্বয় করে গড়ে উঠেছে চমৎকার এই পার্কটি। ফুলের গ্রাম সাবদীঃ নারায়ণগঞ্জ জেলার আকর্ষণীয় একটি এলাকার নাম সাবদী বা ফুলের গ্রাম সাবদী। শীত ও বসন্তে এই গ্রামে সর্ষে ফুলের হলুদাভ রঙ নারাগঞ্জে আজকাল প্রায় সবার ফেসবুকের ওয়ালেই প্রকাশ করা হয়।

তাজমহল

এছাড়াও গোলাপ, গাধা সহ বিচিত্র ফুলের বাগানে রঙবেরঙের দৃশ্যের সমারোহ তৈরি হয় তা অবশ্যই আপনাকে মুগ্ধ করবে। কাইকারটেক হাটঃ শত বছরের পুরনো ও ঐতিহ্যের প্রতিক নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার মোগরাপড়া ইউনিয়নের কাইকারটেক হাট। নানারকম সাংসারিক জিনিসপত্রের সাথে বিখ্যাত বালিশ মিষ্টি ও আরও অনেকরকম খাবার, গ্রাম্য পরিবেশ আপনাকে বই-পুস্তকে পড়া গ্রাম্য হাট’র দৃশ্য অবলোকন করিয়ে ছাড়বে।

উল্লেখ্য যে, সপ্তাহে প্রতি রবিবার এই হাট বসে। এছাড়াও রয়েছে সোনারগাঁও উপজেলার বারদী ইউনিয়নের অবস্থিত মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা ত্রিভুজ আকৃতির মায়াদ্বীপ, আড়াইহাজার উপজেলায় ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সাতগ্রাম জমিদার বাড়ি। বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী হাটখোলা ব্রিজ, নরসিংপুর অঞ্চলের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, নবীগঞ্জ’র কদম রসূল দরগা ইত্যাদি।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin