কাবুলে দিন-রাত্রি (পর্ব- ১)

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

মার্চের মাঝামাঝি অফিস থেকে বললো মাসুদ তুমি দেশে ফিরে যাও কারন করোনা পরিস্থিতি কাবুলে কোন দিকে মোড় নেবে বোঝা যাচ্ছেনা। এবার একমাস হলো মাত্র কাবুলে আসলাম, আবার ফিরে যেতে হবে! অন্যদিকে ভালোও লাগলো! দেশে ফেরা সব সময়েই আনন্দের। প্রায় ৪ মাস দেশে থেকে আবার কাবুলে ফিরে আসলাম। যদিও ওখানে করোনা পরিস্থিতির কোন উন্নতি ঘটেনি, তবুও পেশাগত কারনে ফিরে আসতে হলো। এখানে প্রতিদিন প্রায় দুই শতাধিক মানুষ নতুন করে করোনাতে আক্রান্ত হচ্ছে। কম সংখ্যা দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেননা। টেস্ট হয় গড়ে ৫০০ এর মত। এখনতো সাধারণ মানুষ টেস্টের প্রায় বাইরে। শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তা আর যাদের শক্ত যোগাযোগ আছে তারাই টেস্ট করাতে পারে।

এয়ারপোর্ট থেকে ফেরার পথে ড্রাইভার আকবারকে জিগ্যেস করলাম, এখানে করোনার কি অবস্থা? সে একগাল হেসে বলল, করোনা আমাদের কিছুই করতে পারবেনা! কিন্তু তাদের ক্ষোভ সরকারের প্রতি। এখানে এক হাকিম স্বপ্নে দেখে করোনার প্রতিষেধক আবিস্কার করেছিলো কিন্তু এখানকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তা বন্ধ করে দিয়েছে। ড্রাইভারের মতে আজ হাকিম সাহেব যদি তার ওষুধ বিতরণ করতে পারতেন তাহলে শুধু আফগানিস্তান নয় সারাবিশ্বই করোনা থেকে মুক্তি পেতো। আমি মনে মনে বললাম তোমাদের হাকিমের সাথে আমাদের থানকুনি পাতা যোগ করলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে পরবর্তী নোবেল পুরস্কারটা আমরা যৌথ ভাবে পাওয়ার দাবি রাখি।

কয়েকদিন আগে আকবারকে বললাম আজ থেকে আপনি আমার শিক্ষক। প্রতিদিন আমাকে দারি ভাষা শেখাবেন। পঞ্চাশোর্ধ আকবারের সুরমা লাগানো চোখদুটো বড় হয়ে গেলো। আমাকে ছাত্র হিসেবে পেয়ে সে খুব খুশি। সুমো সাগরেদ খুব আস্ত-মানে তুমি ছাত্র হিসেবে খুব ভালো! আমি বললাম খুশি হবার কিছুই নেই, আমি ছাত্র হিসেবে খুব ভালোনা। প্রতিদিন ৫ টার বেশি শব্দ শিখতে পারবোনা। সে মহা উদ্যমে আমাকে দারি ভাষা শেখানোর কাজে লেগে গেলো। আফগানিস্তানের প্রধান ভাষা হলো দারি আর পাসতো। অফিসিয়াল যোগাযোগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দারি ভাষা ব্যাবহার করা হয়। দারি বলতে গেলে প্রায় পারসিয়ান ভাষা। অনেকেই পারসিয়ান ভাষাকে দারি ভাষা বলে। প্রায় বলছি এ কারনে, উচ্চারন এবং অর্থগত দিক দিয়ে দারির কিছুটা ভিন্নতা আছে। যদিও পাসতুনরা প্রায় ৪২ ভাগ জনসংখ্যা দখল করে আছে, তবুও দারি প্রায় ৭৭ ভাগ লোকের ভাষা। তবে পাসতুনরা সাধারণত পাসতু ভাষায় কথা বলে। ভাষার সাথে জাতিগত বিভাজনের একটি সম্পর্ক আছে। পরবর্তী কোন পর্বে আফগানিস্তানের জাতিগত বিভাজন নিয়ে লিখবো। তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে আফগানিস্তানের প্রধান জাতিগুলো হলো পাসতুন, তাজিক, হাজারা, উজবেক, আইমাক এবং তুর্কমেন।

আকবারকে জিজ্ঞেস করলাম এখানে কেও বেড়াতে এলে এখান থেকে কি কি নিয়ে যায়? সে অনেকগুলো জিনিসের নাম বলল তার ভিতরে কার্পেট, জাফরান আর স্যাফায়ার প্রধান। এখানকার শুকনো কাজু, পেস্তা, কিসমিসও বিখ্যাত। শীতকালে ফলের সমাহার দেখে যে কারো চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। তখন খুব সস্তায় আঙ্গুর, আপেল, বেদানা, আনজির, স্ট্রবেরি ও চেরি পাওয়া যায়। গত শীতকালে আমি ৭ কেজি আঙ্গুর বাংলাদেশি টাকায় ১৪৫ এবং ৭ কেজি বেদানা ১৫৫ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম। এরা কোন কিছু সের হিসেবে বিক্রি করতে পছন্দ করে, বিশেষ করে ফল। ৭কেজিতে ১ সের হয় এখানে।

উইন্টার ইজ কামিং! এখানে প্রায় ৬-৭ মাস শীতকাল। ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় বরফ পড়া। জানুয়ারিতে তাপমত্রা প্রায় ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। শীতপ্রধান দেশ হবার কারনে প্রায় সবার বাসায়ই কার্পেট থাকে। কার্পেটগুলো এখানকার ইতিহাস ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। কার্পেটগুলোতে খচিত হয় জাতীয় বীর, জাফরান ফুল, হিন্দোকুস পর্বত, হযরত আলী (রাঃ) এর মাজার, বাবরের মাজার, হেলিকপ্টার, বন্দুকের নকশা দিয়ে।

ইরানের জাফরান সারা বিশ্বে বিখ্যাত। ইরানের সাথে আফগানিস্তানের হেরাত অঞ্চলের সীমান্ত আছে। যার ফলে একই গুনগত মানের জাফরান হেরাতে উৎপাদন হয়। জাফরানের দাম সম্পর্কে আমার ভালো ধারনা নেই তবে এখানে একটু খোঁজ খবর নিয়ে কিনলে প্রতিকেজি বাংলাদেশি টাকায় ৬০/৭০ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। আমি অল্প পরিমানে কয়েকবার নিয়ে গেছি।

আকবার প্রানপনে চেষ্টা করছে আমাকে দারি ভাষা শেখানোর জন্য। শিক্ষক হিসেবে সে ১০ এ ১২। ২ বেশি বলার কারন হলো সেদিন আকবারকে বললাম, চলো সুপারমার্কেটে যাবো। সুপার মার্কেট থেকে ফেরার সময় খেয়াল করলাম সে আমাকে অন্য পথ দিয়ে ঘুরিয়ে আনছে। সাধারন সময় থেকে প্রায় ১৫ মিনিট বেশি সময় লাগলো। বাড়তি সময়ে সে আমাকে রাস্তার দুপাশে বিভিন্ন জিনিস দেখাচ্ছে আর স্থানীয় ভাষায় সে সব জিনিশের নাম বলছে। আমাকে সে দারি শিখিয়েই ছাড়বে। গাছ, আকাশ, বাতাশ যা সামনে পাচ্ছে তার দারি অনুবাদ আমাকে বলছে। আমিও কিছুটা দারি বলা শিখেছি। কিন্তু অল্প বিদ্যা যে ভয়ংকর তা প্রমানিত হতে বেশিদিন লাগলোনা। একদিন গেস্ট হাউজে নামানোর সময় ভাঙ্গা ভাঙ্গা দারি ভাষায় তাকে বললাম তুমি চলে যাও। কিন্তু প্রোনাউন আর টেন্সের ভুলে সেটা হয়ে গিয়েছিলো তুমি থাকো! রাত ১০ টার দিকে বাইরে বের হয়ে দেখি আকবার এখনো গাড়িতে বসে আছে। আমি ইংরেজিতে তাকে বললাম, তুমি এখনো যাওনি কেনো? উত্তর শুনে খারাপ লাগলো। আকবার হাসিমুখে বলল, মুস্কিল নে আস্ত-মানে কোন সমস্যা নেই!

অফিসের কাজের সুবাদে এখানে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে মিটিং থাকে। কয়েকদিন আগে যুব প্রতিমন্ত্রীর সাথে একটি মিটিং ছিলো। প্রতিমন্ত্রীর সাথে মিটিং বলে কথা। সারারাত ঘুম হারামের মত। কতশত প্রটোকল ফলো করতে হবে কে জানে! সকাল বেলায় প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের অফিসে পৌছালাম। কোন প্রোটকল নয়, সরাসরি এসে আমার নাম ধরে বলল রাস্তায় কোন সমস্যা হয়েছে কিনা। উনি ভালো ইংরেজি জানা সত্ত্বেও দোভাষী ব্যাবহার করতে বললেন। শুধু উনি নয়, আমি আরো কয়েকজন উচ্চপদস্ত সরকারি কর্মতার সাথে মিটিং করেছি। তারা সবাই দোভাষী ব্যাবহার করতে বলেন। বুঝলাম এরা জাতিয়তাবোধ এবং সতন্ত্রতাবোধ বজায় রেখে চলে। এটাকে আমি সাধুবাদ দেই। প্রত্যেক জাতির সতন্ত্রতাবোধ থাকা উচিত। তবে এখানে একটা মজার ব্যাপার হলো সাধারন জনগনের কাছে মন্ত্রীদের নাম্বার সেভ করা থাকে। সময়ে অসময়ে সরাসরি মন্ত্রীদের ফোন দিয়ে বসে!

নিরাপত্তার কারনে সাধারণত বিদেশীদের অফিসের বাইরে যেতে দেয়না। তবে এবার কাজের ক্ষেত্রে আমাকে যেতেই হলো। কাবুলের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় চারপাশ দেখে মনে হবে কোন সভ্যতার নতুন করে শুরু হচ্ছে। রাস্তার দু ধারে নতুন নতুন অবকাঠামো হচ্ছে। উচু বিল্ডিং হচ্ছে। বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড অনেক যায়গাতে দৃশ্যমান বিজ্ঞাপন গুলোতে ছেলে মেয়ে উভয়ের ছবিই ব্যাবহার করা হচ্ছে। যুদ্ধে বিধ্বস্ত অনেক পুরাতন বাড়ি ভেঙ্গে নতুন বাড়ি হচ্ছে। পরিবর্তন দৃশ্যমান!

আমার যাওয়া উপলক্ষে করোনা উপেক্ষা করে সেখানে দেখালাম প্রায় ৩ শতাধিক লোকের সমাগম। তাদের চোখগুলো আশা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের প্রত্যকের বিশ্বাস আমি তাদের জন্য কিছু করবো। আমাকে একটি মসজিদের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হলো। সাধারনত সামাজিক জনসমাবেশ গুলো এখানে মসজিদে হয়। যেই শোনে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, সাথে সাথে বলে উঠে, অহ! ক্রিকেট! সাকিব আল হাসান! তামিম ইকবাল! আফগানিদের মুখে সাকিব-তামিমের নাম শুনলে যতটুকু আনন্দ হয়, তারা সেঞ্চুরি করলেও হয়তো এতো আনন্দ হতোনা।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin