কাবুলের দিনরাত্রি

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

পুর্ববর্তী ‘কাবুলের দিনরাত্রি’ লেখাগুলোতে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন আফগানিস্তানের খাবার নিয়ে লেখার জন্য। আমি কিছুটা সময় নিচ্ছিলাম খাবারগুলো নিজে চেখে দেখার জন্য। আজ চেষ্টা করবো আফগানিস্তানের প্রসিদ্ধ খাবারগুলো আপনাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য। সবার চোখে নিশ্চয় এখন কাবাব আর নানের ছবি ভাসছে! সব ধরনের আফগানি খাবারের কথা হয়তো এক পর্বে সম্ভব নয়। তাই এই পর্বে শুধু প্রসিদ্ধ খাবার গুলো নিয়ে কথা বলবো। আরেকটি কথা, এখানে অঞ্চল (প্রভিঞ্চ) ভেদে খাবারের ধরনও কিছুটা ভিন্ন হয়।

আজ সেইসব খাবারের কথাই বলবো যেগুলো সব অঞ্চলেই মোটামুটি প্রসিদ্ধ।এখানকার প্রধান খাবার কি? এক কথায় নান। সকালে চায়ের সাথে নান, দুপুর আর রাতে ভাত বা সবজির সাথে নান। প্রতিবেলায় নান ঠিক রেখে অন্যান্য উপাদান পরিবর্তিত হয়! নানের সাথে আরো পরিবেশিত হয় ঝোল ঝোল ভেড়ার মাংস, সালাদ, কাবাব, ম্যাকারনি এবং দই। বাহারি সাইজের নান। কোন কোন নানের সাইজ প্রায় ৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত হয়। কাপড়ের দোকানে যেমন সারি সারি কাপড় ঝোলানো থাকে,এখানে খাবারের দোকানগুলোতেও নান ঝোলানো থাকে।

নানগুলো শক্ত আর পুরু হয়। এক আফগানি একবার বাংলাদেশে যেয়ে সকাল বেলার নাস্তায় ৪২টা পরোটা খেয়েও তার নানের স্বাদ পরোটাতে মেটেনি!আমি প্রথম প্রথম নান খাওয়ার চেষ্টা করেছি। প্রতিবার নানের সাথে একটা হাতুড়ির অভাব বোধ করি! এক সময় হাল ছেড়ে দিয়েছি।এখানকার বিশেষ খাবার কি? অবশ্যই কাবুলি পোলাও! এর উপাদান হলো বাসমতী চাল, কিসমিস, কাজুবাদাম, গাজর কুচি আর বিন। সাথে থাকে ভেড়ার ঝোলহীন মাংস।

মাংসের টুকরোগুলো পোলাওয়ের ভিতরে লুকোচুরি খেলে। নরম পোলাও এর সাথে কাজুবাদাম আর কিসমিস মুখে গেলে স্বাদ আর স্বাদ! একবার কাবুলি পোলাও খেলে আপনি নিজের অজান্তেই বলে উঠবেন, আহা! বাসায় কোন বিশেষ অনুষ্ঠান থাকলে, মেহমান এলে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বা বিশেষ কোন দিনে এরা কাবুলি পোলাও রান্না করে। এখানে আরো পাওয়া যায় উজবেকি পোলায়, মালাং পোলাও। স্বাদ প্রায় একই ধরনের।নিশ্চয় কাবাবের বর্ননার জন্য অপেক্ষা করছেন ! এখানকার কাবাব সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। ভেড়া, গরু, মুরগী দিয়েই প্রধানত বানানো হয় কাবাবগুলো।

কয়েকটি প্রধান কাবাবের নাম বলি। কাবাব-ই- কুবিদাহ (লম্বাটে ভেড়া বা গরুর মাংসের কাবাব), কাবাব-ই-জিগার (কলিজার টুকরো দিয়ে বানানো কাবাব), সামি কাবাব, কাবাব-ই-মুর্গ (মুরগীর কাবাব), চোপান কাবাব ( এক ধরনের পাসতোন কাবাব, প্রধানত ভেড়ার চর্বি দিয়ে তৈরি), সিনওয়ারি কাবাব (ভেড়ার মাংসের কাবাব, আমার পছন্দের কাবাব!), শিক কাবাব, চাপলি কাবাব (গোল মাংসের টুকরোর কাবাব)।

কাবাবগুলোর আসল স্বাদ ধরে রাখার জন্য সাধারণত অন্যান্য মসলা খুব অল্প পরিমানে মেশানো হয়। কাবাবের সাথে পরিবেশন হয় নান আর ধনে পাতা দিয়ে বানানো এক ধরনের জুস। এক টুকরো কাবাব, এক টুকরো নান আর এক চুমুক ধনে পাতার জুস! আহা! আহা!এখানকার কোর্মাও কম বিখ্যাত নয়। বাংলাদেশি কোর্মার সাথে অনেকটা মিল আছে। অনেক কোর্মাতে পেস্তা বাদাম, কিসমিস মেশানো হয়। কোর্মাগুলোর নাম ও বাহারি হয়-কোর্মা-ই-গোস্ত (মাংসের কোর্মা), কোর্মা-ই-মুর্গ (মুরগীর কোর্মা), কোর্মা-ই-সাব্জ (সবজির কোর্মা), কোর্মা-ই-নাদরু (রসুনের কোর্মা)।আফগান জালেবি গানের কথা নিশ্চয় মনে আছে? জী। সত্যিই এখানে আফগান জালেবি পাওয়া যায়।

দেখতে চিকন আর স্বাদে অতুলনীয়। এখানে এসে বুঝতে পেরেছি কেনো ক্যাট্রিনাকে আফগান জালেবি বলা হয়! কোন উৎসবে আফগান জালেবি সাইড ডিস হিসেবে অতুলনীয়।আরেকটি প্রসিদ্ধ সাইড ডিস হলো মান্তো। এটা কিছুটা বাংলাদেশি মমর মত। মান্তোর ভিতরে থাকে মাংসের ছোট ছোট দানা। মান্তোতে এক ধরনের আফগানি মসলার গন্ধ থাকে। মান্তোর সাথে পরিবেশন করা হয় হাল্কা পোড়ানো টমেটো, দই বা কুরুট (এটি এক ধরনের চিজ)।এখানকার আরেকটি প্রসিদ্ধ খাবার হলো বোলানি। নানের নমনীয় ভার্সন! এটা কিছুটা চাপাতির মত। দুই লেয়ার বিশিষ্ট বোলানির মাঝে ভরে দেয়া হয় সবজি বা মাংস। বোলানিকে পারাকি ও বলা হয়।

বোলানি মেইন ডিস নয়। এটা খাওয়া হয় কাবাব, নান বা কাবুলি পোলাওয়ের মত মেইন ডিসের সাথে।পানীয় হিসেবে গ্রিন টি আর টক দই প্রায় সব খাবারের সাথে পরিবেশন করা হয়। এখানে চায়ের সাথে চিনি মেশালে মানুষ হা করে তাকিয়ে থাকবে! চা মানেই চিনি ছাড়া চা। এখানে টং দোকানে চা বিক্রি হয়না কারন মানুষ সাথে চায়ের কেটলি নিয়ে ঘোরে! আমার কাছে অবাক লাগে যখন দেখি শুধু নান গ্রিন টি দিয়ে চুবিয়ে খাচ্ছে। এখানকার দই সব সময় টক।

মিস্টি দইয়ের বালাই নেই।আফগানিস্তানের আরো কিছু প্রসিদ্ধ খাবার হলো-আশোক (এক ধরনের পুডিং), হাফত-মেওয়া (বিভিন্ন ধরনের ফল দিয়ে তৈরি), শির খুর্মা (মিষ্টি জাতীয়, খেজুর দিয়ে তৈরি), বোরানি বাঞ্জান (বেগুন আর দই দিয়ে তৈরি), কোর্মা কোফতা (মাংসের বল), আউস ( ঘরে তৈরি নুডুলস)আগেই বলেছি এক লেখাতে আফগানিস্তানের খাবারের বর্ননা দেয়া সম্ভব নয়। সুযোগ হলে আরো একটি পর্বে অঞ্চল ভেদে খাবারের বিচিত্রতা নিয়ে লিখবো। এখানে হোটেলগুলোতে ছবিতোলা প্রায় নিষিদ্ধ। তাই অধিকাংশ ছবি ইন্টারনেট থেকে নেয়া।বানান ভুল মার্জনা করবেন।কাবুল থেকে

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin