কষ্টে দিন কাটছে না.গঞ্জের লঞ্চ শ্রমিকদের

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

দিন-রাত মিলিয়ে নারায়াণগঞ্চের লঞ্চঘাটগুলোতে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষদের পদচারণায় মুখরিত থাকতো। তবে করোনার তৃতীয় ঢেউ মোকাবিলায় গত ২২ জুন থেকে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় এবারে পিনপতন নিরাবতা নিস্তব্দতা বিরাজ করছে নগরীর লঞ্চঘাটগুলোতে।

কোন মানুষ নেই লঞ্চঘাটে।

এ কারণে সবচেয়ে ব্যস্ততম নারায়াণগঞ্জ ৫ নং ঘাট নদীবন্দরেও এখন গোমটভাব বিরাজ করছে। ভাসমান ও পথশিশুদের পদচারণা ছাড়া যাত্রীদের যেমন পদচারণা নেই এখানে, সেই সঙ্গে নেই ঘাট শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা আর লঞ্চ শ্রমিকদের দৌড়ঝাপ।
শুনতে পাওয়া যায় না লঞ্চের ইঞ্জিন ও সাইরেনের শব্দ।
নদীবন্দর ঘুরে দেখা গেছে, বন্দরের সবকয়টা জেটি জুড়ে নোঙর করে পানিতে ঠায় ভাসছে অভ্যন্তরীণ ও দুরপাল্লা মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত লঞ্চ।

লুডু খেলে অলস সময় কাটাচ্ছে শ্রমিকরা।

যে লঞ্চগুলোতে দেখভালের জন্য কিছু কর্মচারী শুয়ে-বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন। আর চোঁখে মুখেই বিষন্নতার ছাপ নিয়েই দিনগুলো পার করে যাচ্ছেন তারা।
ওয়াক্তের নামাজগুলো লঞ্চেই জামাতের সহিত আদায় করছেন। খাওয়া-দাওয়া, নামাজ আদায়ের বাহিরে যে সময় থাকে, সেটুকু নিজেদের মধ্য গল্প করে কিংবা লুডু খেলে পার করছেন।
তবে এটা যে তাদের দায়িত্বেরই একটা অংশ তা জানালেন নারায়াণগঞ্জ -চাঁদপুর নৌ-রুটের এক লঞ্চের ডেক ক্রু ও বাসিন্দা মো. রমিজউদ্দিন।

তিনি বলেন, যে কোনো লঞ্চের প্রতিটি স্টাফই দায়িত্বশীল। লঞ্চ চলুক আর না চলুক কোম্পানির মালিক আমাদের ওপর ভরসা করেই কোটি টাকার এ সম্পদ পানিতে ভাসিয়েছেন। তাই লকডাউনে ঘাটে বেঁধে রাখা লঞ্চটির দেখভাল আমাদেরই করতে হবে।

এটি যাত্রীবাহী বাসের মতো পার্কিং করে রেখে গেলেই হয় না, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। খোয়া যেতে পারে মালামাল। তাই ইচ্ছে থাকলেও বাড়িতে যেতে পারছি না।


তিনি আরও বলেন, আমাদের লঞ্চে মোট যে স্টাফ আছে তারমধ্যে অর্ধেকের মতো লোক বর্তমানে বাড়িতে রয়েছে। বাকি অর্ধেক অর্থাৎ এক শিফট স্টাফ লঞ্চে আছি। লঞ্চ চলাচল না করায় কোম্পানিরও লোকসান হচ্ছে, ফলে বেতন-ভাতায় কিছুটা বিলম্ব হলেও পেয়েছি। কোম্পানির নিয়মে লঞ্চেই খাওয়া-দাওয়া চলছে, যদিও ব্যক্তিগত খরচ বেড়েছে। তাই বাড়ির মানুষগুলোকে কোরবানির ঈদে খুশি রাখতে পারব না।

এ রুটের বাসিন্দা রাজিব হোসেন জানান, প্রতিটি লঞ্চেই কিছু স্টাফ রয়েছেন, যারা লঞ্চগুলো দেখভাল করছেন। তবে ঘাটে নোঙর করা বরিশাল-ঢাকা রুটের অন্য দুটি লঞ্চের থেকে তাদের বেতন কিছুটা বেশি। যদিও ঘাটে অলস সময় পার করতে গিয়ে সার্বিক খরচ কিছুটা বেড়েছে।

তিনি বলেন, লকডাউন আর বেতনের জটিলতায় সময়মতো টাকা পাঠাতে না পারায় বাড়িতে স্বজনরা কোনাভাবে দিনপার করছে। দায়িত্বের জায়গা থেকে এবং লকডাউনের কারণে বাড়িতে যেতে পারিনি, তাই এবারের কোরবানির ঈদ লঞ্চেই কাটাতে হবে। আর পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাড়িতে যেতেও পারছি না।

এসব লঞ্চগুলোর অন্য স্টাফরা জানান, লঞ্চ স্টাফদের বেতন আহামরি বেশি নয়, তবে লঞ্চ চললে কোম্পানি থেকে যেমন সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়, তেমনি যাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া বকশিসসহ বিভিন্ন কাজে বাড়তি আয়ের সুযোগ থাকে।

তবে লঞ্চ চলাচল বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে এসব সুযোগ বন্ধ রয়েছে। যারা লঞ্চে আছেন তাদের অনেকে বেতন পেয়েছেন বোনাস পাননি, আবার অনেকে এখনো বেতন পাননি। আর যারা বাড়িতে রয়েছেন তাদের অবস্থা আরো শোচনীয়। এছাড়া লঞ্চ চলাচল না করায় কলম্যান, ঘাট শ্রমিক, ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও খারাপ দিন কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ তো মানুষের কাছ থেকে হাত পেতেও সাহায্য নিচ্ছেন, আবার কেউ ধারসহ বিভিন্ন কারণে দেনাগ্রস্ত হচ্ছেন।

তারা জানান, লকডাউনে সরকারি সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ, কিন্তু বাস্তবতায় লঞ্চের শ্রমিকরা কিছুই পায়নি।

লঞ্চ খান রিভার সার্ভিসের মাস্টার নিয়ামত আলীর মতে অমানবিক ও অর্বননীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটছে লঞ্চ শ্রমিকদের। যেমন কাজ নেই, তেমনি কোনো সহায়তাও নেই।

লঞ্চ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি ও সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু জানান, করোনার প্রথম ধাক্কাই সামলে উঠতে পারেননি লঞ্চ মালিকরা। তারপরও বেতনসহ শ্রমিকদের সহায়তা দিতেও মালিকরা চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লঞ্চ শ্রমিকদের একটা তালিকা পাঠানো হয়েছে। আশা করছি সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহ আলম, নৌ-শ্রমিকদের প্রণোদনার জন্য সরকারের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin