করোনা ভাইরাস এবং শিক্ষকদের জীবন

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

বৈশ্বিক করোনা ভাইরাসের প্রকোপে সারা বিশ্ব আজ স্থবির হয়ে পড়ে আছে। থেমে গেছে সকল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ। অনেক মানুষ হারিয়েছে তাদের কর্ম অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসায়ের পুজি হারিয়ে আজ সর্বস্বান্ত। অন্য যে কোন সেক্টরের মত আমাদের শিক্ষা খাতও ব্যপক চ্যালেঞ্জের মুখে দাড়িয়েছে। দেশব্যপী করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হবার আগেই সরকার গত ১৭ ই মার্চ থেকে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করে। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে ২/১ মাসের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকতে পারে এমন অনুমান করা হলেও করোনা পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি সরকারকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটিকে আরো দীর্ঘায়িত করতে বাধ্য করে। দীর্ঘ ছুটির কারনে স্থগিত হয়েছে এইচ.এস.সি এবং সমমানের পরীক্ষা, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্যবিদ্যালয়ের নিয়মিত পরীক্ষা ।দীর্ঘ এক সেশনজটের কবলে পড়তে যাচ্ছে দেশের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা। সরকার জে.এস.সি এবং পিইসি পরীক্ষার ব্যপারে এখনো কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারে নি। সংক্ষেপে বলতে গেলে বলা চলে করোনার প্রভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এক বিরাট সংকটের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে এটা সহজেই অনুমিত। 

করোনা সংকটের জন্য শিক্ষার্থীদের সমস্যার কথা বিভিন্ন মিডিয়ায় আলোচিত হলেও এই সেক্টরের সাথে জড়িত মানুষদের কথা উঠে এসেছে খুবই অল্প। বিগত বিশ বছর ধরে এদেশে স্বাক্ষরতার হার উর্ধমুখী। বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষা সেবা দেয়ার নিমিত্তে গড়ে উঠেছে অজস্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সরকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে পাল্লা  দিয়ে বেড়েছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে নানান সময়ে বিভিন্ন অভিযোগ থাকলেও এদেশের শিক্ষার বিস্তারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভুমিকা অস্বীকার করার মত নয়।

করোনার প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতি গ্রস্থ হয়েছে প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। টানা বন্ধের কবলে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের পথ।এক জরিপে দেখা গেছে করোনার কারনে প্রায় ৪৩.৯০% শিক্ষার্থীর পরিবার দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছে যা করোনার আগে ছিল ২৩.৯০%। তবে আশার খবর হলো খুব দ্রুতই দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাড়াচ্ছে। নামি-দামি কিছু প্রতিষ্ঠান প্রথমে শিক্ষকদের বেতন ভাতা দিলেও বিগত কয়েক মাস ধরে সব ধরনের বেতন-ভাতা বন্ধ। পাশাপাশি বন্ধ তাদের প্রাইভেট টিউশনও। সমাজের সবচেয়ে আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষগুলো আজ বড্ড অসহায়। অনেক শিক্ষক পরিবারসহ পাড়ি জমিয়েছেন গ্রামে। ঈদে বেতন পাওয়া হইনি বলে পরিবারের কাউকে কিছু কিনে দিতে পারেন নি। প্রথম কিছুদিন পরিচিতদের কাছ থেকে ধার পাওয়া গেলেও এখন সেটাও বন্ধ। তার উপর রয়েছে পাওনাদারদের চাপ। চার দেয়ালে বন্দী আজ সমাজ গড়ার কারিগরদের চাপা কান্না। এই কান্না সমাজপতিদের কানে যায় কী?  

ভাড়ায় চালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা আরো ভয়াবহ। শিক্ষকদের বেতন বকেয়া, বাড়ীভাড়ার চাপ সব মিলিয়ে কোনঠাসা মালিক কর্তৃপক্ষ। অনেক মালিক এসব চাপ সইতে না পেরে নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিক্রির বিজ্ঞাপন সেটে বেড়াচ্ছেন শহরজুড়ে।কিন্টারগার্ডেন স্কুল বিক্রির বিজ্ঞাপন নিয়ে করা রিপোর্ট দেখে বিচলিত হননি এমন মানুষ খুজে পাওয়া দুষ্কর। বেসরকারি স্কুল শিক্ষকের ছেলের বাসে বাসে মাস্ক, টুথব্রাশ বিক্রির খবর ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। স্কুল শিক্ষকের বাধ্য হয়ে জীবন ও জীবিকার তাগিদে দিনমজুর বা মোটর শ্রমিক হয়ে যাওয়ার ঘটনাও নাড়িয়ে দিয়েছে জাতির বিবেককে। 

বিগত এক দশকে এদেশে কোচিং সেন্টারগুলোর ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মানহীন পড়ালেখা, প্রতিযোগিতা মুলক পড়ালেখা আর অভিভাবকদের সন্তানদের পড়ালেখার প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি এর প্রসারে রেখেছে ব্যাপক ভুমিকা। অসংখ্য তরুন মেধাবীরা নিজেদের ক্যারিয়ার গড়েছে কোচিং পেশায়। একাডেমিক এবং এডমিশন কোচিং এর পাশাপাশি চাকুরী প্রস্তুতির কোচিংয়ের জনপ্রিয়তাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাকুরির পিছনে না ছুটে অনেকে ক্যারিয়ায় হিসেবে বেছে নিয়েছে এই পেশা। ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছে এই খাত। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ লাখ লোক এই পেশার সাথে জড়িত যার অধিকাংশই তরুন। সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা না থাকায় এই সেক্টর এখনো অনেকটা এলোমেলো। করোনার প্রভাবে প্রায় ৬ মাস যাবত এই খাত স্থবির হয়ে আছে। এই খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট কেউই ভালো নেই। অধিকাংশ কোচিং সেন্টার তাদের প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান নিশ্চিত করতে না পারায় বন্ধ করে দিয়েছে তাদের কার্যালয়। অনলাইনে কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম চালালেও প্রত্যাশিত আয় তারা করতে পারছে না। পার্টটাইম করা অনেক শিক্ষককে ছাটাই এর স্বীকার হতে হয়েছে। নগরীর নামি-দামি কোচিংগুলো ভাড়া পরিশোধ না করতে পারায় ছেড়ে গেছে তাদের কার্যালয়। 

এক বেসরকারি জরিপের তথ্য মতে শুধু নারায়ণগঞ্জ শ রেই বন্ধ হয়েছে প্রায় ১২০ এর অধিক কোচিং সেন্টার। আর বন্ধ হয়ে যাবার উপ্রক্রম হয়েছে আরো শতাধিক প্রতিষ্ঠান। সহসাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না খুললে স্থায়ী ভাবে বন্ধ হবে আরো অগনিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার গুনগত মানের অবনতির আশংকা থেকে যাবে আর কর্মহীন হবে আসংখ্য তরুন। সরকার বিভিন্ন সেক্টরের জন্য প্রনোদনা প্যাকেজ ঘোষনা করলেও এই সেক্টর নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোন ঘোষনাই ছিল না। আর্থিক কোন অনুদানও পায়নি সেক্টর সংশ্লিষ্ট কেউ।

এই সেক্টর সংশ্লিষ্ট সবাই এখন মানবেতর জীবন যাপন করছে। এটা সহজেই অনুমেয় যে সকল সেক্টরের পরেই খুলবে এই সেক্টরের তালা। আগামী ২৫ আগষ্টের পর হয়তো কোন সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসতে পারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে। এই সেক্টর টিকিয়ে রাখার জন্য জরুরী ভিত্তিতে যে কোন পদক্ষেপ নেয়াএখন সময়ের দাবি।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin