একজন রাজনীতিবিদ ও সমাজ সংস্কারকঃ খান সাহেব ওসমান আলী

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

আসফাক আহমেদ শিহাব

প্রাচ্যের ড্যান্ডি নারায়ণগঞ্জ। ঐতিহাসিক এই নারায়ণগঞ্জে মিশে আছে বহু স্মৃতি। নানান ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী এই নারায়ণগঞ্জ। ঐতিয্যবাহী সোনারগাও ঘেষে গড়ে উঠা নারায়ণগঞ্জে রয়েছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। ২৯২ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে গঠিত এই জেলাকে ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা হিসেবে ঘোষনা করা হয়।

নারায়ণগঞ্জের আধুনিকায়নের পিছনে কিছু মহৎব্যক্তিত্বদের অবদান রয়েছে। তাদেরই মধ্যে একজন খান সাহেব ওসমান আলী। খান সাহেব ওসমান আলী একাধারে ছিলেন একজন রাজনীতিবীদ, তৎকালীন আমলের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং সমাজসেবক। তার জন্ম হয় ১৯০০ সালের ১লা জানুয়ারি, কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার জামালকান্দি গ্রামে। তার পিতা হলেন হাজী ডেঙ্গু প্রধান।

তারই সন্তান হলেন এ কে এম শামসুজ্জোহা এবং নাতিগন হলেন আমাদের নারায়নগঞ্জের বর্তমান রাজনীতির প্রাণপুরুষ শামীম ওসমান, নাসিম ওসমান এবং সেলিম ওসমান। খান সাহেব ওসমান আলী নিজ গ্রামের স্কুলেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ১৯২০ সালে প্রবেশিকা পাস করেন। অতঃপর তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। এম ওসমান আলী ছাত্র জীবনেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।

তিনি কলেজ বয়কট করে ১৯২০ সালে খেলাফত আন্দোলন এবং পরে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। এ সময় তিনি অসহযোগ আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। ওসমান আলী অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে নারায়ণগঞ্জে এসে রাজনীতির পাশাপাশি পাট ব্যবসা শুরু করেন। এ সময়ে তিনি কমিউনিস্ট নেতা বেণুধর, বিপ্লবী নেতা অনিল মুখার্জী ও জ্ঞান চক্রবর্তীর সংস্পর্শে আসেন।উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে নারায়ণগঞ্জের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দু ও মাড়োয়ারীদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল।

নারায়ণগঞ্জে এ সময় অনেক এজেন্সি ও ব্রোকার হাউস গড়ে ওঠে। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই ছিল ইউরোপীয় ও পশ্চিম ভারত থেকে আগত মাড়োয়ারী সম্প্রদায়ের। ব্যবসাক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানদের দৈন্যদশা লক্ষ্য করে ওসমান আলী নিজে ব্রোকার হাউজ খুলে পাট ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর ব্যবসার প্রসার ঘটে।লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হলে ওসমান আলী নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনকে সংগঠিত করেন এবং বামপন্থী ও অন্যান্য স্থানীয় নেতাদের সহযোগিতায় সেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেন।

এম ওসমান আলী ১৯৪৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে (নারায়ণগঞ্জ দক্ষিণ নির্বাচনী এলাকা) ঢাকার নবাব খাজা হাবিবুল্লাহকে পরাজিত করে বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি নারায়ণগঞ্জ শহর মুসলিমলীগের প্রেসিডেন্ট এবং ঢাকা জেলা মুসলিমলীগের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ শহর মুসলিমলীগের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৬ সালে নারায়ণগঞ্জে ‘ঝুলনযাত্রা’ উপলক্ষে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সমঝোতা আনয়নে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ঢাকা জেলা মুসলিমলীগে ঢাকার নবাবদের সঙ্গে প্রগতিশীল ধারার রাজনীতিবিদদের মতবিরোধ দেখা দেয়।

এ বিরোধে ওসমান আলী প্রগতিশীল ধারাকে সমর্থন করেন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে নারায়ণগঞ্জে গণসংবর্ধনা দেন। এম ওসমান আলী ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম বিরোধীদল আওয়ামীমু সলিমলীগের প্রতিষ্ঠাতা-সদস্যছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। এ জন্য তিনি কারারুদ্ধ হন। ১৯৬২ সালের শাসনতান্ত্রিক আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ওসমান আলী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।এম ওসমান আলী সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় ত্রিশের দশকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ‘সবুজ বাঙলা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

এ পত্রিকায় লিখতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহিতলাল মজুমদার, জসীমউদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদ, অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন, বন্দে আলী মিয়া, কাজী আবদুল ওদুদ, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকাসহ অনেক প্রভাবশালী কবি-সাহিত্যিক ।এম ওসমান আলী ১৯৩৮ সালে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ওসমানিয়া হাই স্কুল, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মসজিদ।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের তানজিম মুসাফির খানা, রহমতুল্লাহ অডিটোরিয়াম ও গণপাঠাগার নির্মাণে তাঁর অবদান ছিল। এসব জনহিতকর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ১৯৪০ সালে ‘খানসাহেব’ উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের দমন নীতির প্রতিবাদে তিনি ১৯৪৪ সালে এ উপাধি বর্জন করেন। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ এই সমাজ সেবকের মৃত্যু হয়।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin