আমাদের মধ্যবৃত্তের কোরবানীর ঈদ

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

আফজাল আলম পেশায় একজন বেসরকারি চাকুরীজীবি। নারায়ণগঞ্জের মাসদাইরে থাকেন। গ্রাম ছেড়ে উন্নত জীবনের আশায় নারায়নগঞ্জে পাড়ি জমিয়েছেন বছর পাচেক হবে। গতকাল বেতন পেয়েছেন। এই ঈদে বোনাস দেওয়ার কথা থাকলেও করোনার কারনে বোনাস দেয়নি মালিকপক্ষ। বেতনের টাকা পেয়ে হাসি মুখ থাকার কথা থাকলেও এবার আফজালের মুখে কোন হাসি নেই। রাজ্যের চিন্তা মাথায় এসে ভর করছে তার মাথায়। গত ঈদে ছেলে ফার্দিন আর মেয়ে ফনায়াকে কথা দিয়েছিল এবার তাদের নিয়ে হাটে যাবে। গরু কিনবে। কিন্তু এবারও সম্ভব হবে না কোরবানি দেয়া। বাসায় গিয়ে বাচ্চাদের কিভাবে বুঝাবেন আফজাল আলম তা চিন্তা করতে করতে বাড়ির পথে হাটছেন। যেই কয় টাকা বেতন পেয়েছেন বাসা ভাড়া, দোকান বাকি আর বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে সব শেষ হয়ে যাবে প্রায়।

বাসায় ঢুকতেই দরজা খুলে দেয় স্ত্রী রিজিয়া। স্বামীর শুকনো মুখ দেখে বুঝতে বাকি থাকেনা রিজিয়ার, কিছুই পরিকল্পনা মাফিক হয়নি। খাবার খেতে খেতে আফজাল সব বুঝিয়ে বলে রিজিয়াকে। স্ত্রী বুঝলেও বাচ্চাদের কিভাবে বুঝাবেন তাই নিয়ে চিন্তিত দুইজন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে দুই সন্তান ঘুম থেকে উঠে বায়না ধরে হাটে যাবার জন্য। আফজালের মনের আকাশের মত ই আকাশ তখন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। মুহুর্তেই বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির দোহাই দিয়ে বাচ্চাদেরকে হাটে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারলেন আফজাল। রাতে আফজালের ছোটবেলার বন্ধু ফোন দেয় গরু কিনেছে কিনা খোজ নিতে। এপাশ থেকে কোন উত্তর দিতে পারে না আফজাল। মনের অজান্তেই দুচোখ গড়িয়ে পানি পড়ে আফজালের।

ঈদের আগের দিনের সকাল। বাসা ভাড়া, দোকান বকেয়া আর যাবতীয় বিল মিটিয়েছে আফজাল। কিছু টাকা গ্রামে থাকা বাবা-মায়ের জন্য পাঠিয়েছে। বাচ্চাদের ঈদের কাপড় কেনা হয়নি। স্ত্রী আর বাচ্চাদের নিয়ে বের হয় আফজাল। বাচ্চাদের নতুন কাপড় আর জুতা কিনে দিয়ে স্ত্রীকে একটি ড্রেস কিনে দিয়ে চায়। গত ঈদেও কিছু দেওয়া হয়নি। এবার তো কিছু দেয়া দরকার। কিন্ত রিজিয়া নাছোড়বান্দা। এবারও সে কিছুই নিবে না। আফজাল- রিজিয়া কেউই কিছু নেয় নি এবারের ঈদে।

ঈদের দিন। ছেলে ফার্দিনকে নিয়ে ঈদের নামায পড়ে তাড়াতাড়ি করে বাসায় ফিরে আসে আফজাল। পরিবারের সবাই মিলে সেমাই খায়। বাবা-মার সাথে বাচ্চারা ছবি তুলে ভালোই মজা করে। বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়। খাবারের টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে। খিচুরির সাথে ফার্মের মুরগীর মাংস। ফার্দিন গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি খেতে চায়। কোরবানির ঈদে গরুর মাংস ছাড়া সে কিছুতেই খাবে না। আফজাল আর রিজিয়া একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। একমাত্র ছেলের ছোট্ট আবদার পুরন করতে না পারায় লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে হয় আফজালের।

বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে আফজাল। পিছন থেকে রিজিয়া এসে হাতে ৫০০ টাকা গুজে দেয় আফজালের। বাজার খরচ থেকে কিছু কিছু বাচিয়ে সে এই টাকা জমিয়েছে। স্বামীর হাতে গুজে দিয়ে বলে শহরের চাষাড়া রেললাইনের কাছে থেকে স্বল্প মুল্যে গরুর মাংস কিনে আনাতে। প্রবল আত্মসমানের অধিকারী আফজাল একমাত্র ছেলের মুখে তাকিয়ে বের হয় সন্ধ্যার পর মাংস কিনার জন্য। দরদাম করে বেছে ২ কেজি মাংস কিনে আফজাল। বাড়ি ফিরার সময় লজ্জায় মনে হচ্ছিল মাটিতে মিশে যেতে।

বাসায় গিয়ে স্ত্রীর হাতে মাংস তুলে দিয়ে বারান্দায় চলে যায় আফজাল। সিগারেট হাতে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করতে থাকে কিভাবে মিলবে এই টানাপোড়েনের সংসার থেকে মুক্তি। আকাশে মেঘ জমেছে। বিদ্যুৎ চমাকানো ও শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি শুরু হবে। ঘর থেকে ডাক দেয়
রিজিয়া, খাবার প্রস্তুত। বাচ্চাদের সাথে নিয়ে খাবার খায়। ফার্দিনের তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার দৃশ্য দেখে দুজনের চোখেই পানি চলে আসে। খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই বসে যায় টিভির সামনে এক সাথে বসে ঈদের অনুষ্ঠান দেখে। টিভি দেখতে দেখতে কখন যে বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেছে টেরই পায় নি আফজাল-রিজিয়া। বাচ্চাদের শুইয়ে দিয়ে ঘুমের প্রস্তুতি নেয় তারা। এভাবেই কেটে যায় আফজালদের ঈদ।

আফজালের মতই সমাজের বাকি মধ্যবৃত্তদের গল্পটা এক। একই গল্পের স্ক্রিপ্টে চরিত্রগুলো ভিন্ন। এদের টানাপোড়েন আর প্রবল আত্মসম্মান বিসর্জনের ঈদটাকে আনন্দঘন করার জন্য সমাজের বৃত্তবানদের কী কিছুই করার নেই?

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin