আফগানিস্তান এবং নারী

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

প্রথমবার কাবুলে আসার সুবাদে বেশ কয়েকজন আফগানির সাথে বন্ধুত্ব হয়। কানিশকা (ছেলে নাম) তার ভিতরে একজন। আমার দেখা অন্যতম বুদ্ধিমান মানুষ। প্রায় আমাকে নিয়ে ঘুরতে বের হতো। একদিন বলল, মাসুদ তোমাকে আমার বাসায় নিয়ে যাবো। আমি একটু অবাক হলাম, কারন যত কাছের হোক না কেনো আফগানিরা সাধারনত বাইরের কাউকে তাদের বাসায় নিতে চায় না। যেতে যেতে বলল, আমিই প্রথম বিদেশি যে তাকে তার বাসায় নিচ্ছে। আমি ধন্য বোধ করলাম! বাসার সামনে আমাকে গাড়িতে বসিয়ে বলল সে কিছুক্ষণ পর এসে আমাকে নিয়ে যাবে।

এ কেমন দাওয়াত বাবা! আমি বাইরে বসে থাকবো? ২০ মিনিট পর সে আসলো। বলল, এবার চলো। আমি বাসার ভিতরে ঢুকলাম। প্রায় জনমানব শূন্য। জিজ্ঞেস করলাম তোমার বাসায় আর কেউ নেই? বলল ওর স্ত্রী, মা সবাইকেই অন্য কক্ষে পাঠানো হয়েছে। এবার বুঝলাম, কেনো সে ২০ মিনিট সময় নিয়েছিলো ! বাসার নারীদের অন্য কক্ষে পাঠানোর ব্যাবস্থা করেছিলো। পুরোটা সময় জুড়ে আমি কোন নারী কণ্ঠের শব্দ শুনতে পাইনি। আলাপচারিতায় আফগানিরা যে বিষয়টা সবচেয়ে অপছন্দ করে তা হলো তাদের স্ত্রী এবং মেয়ে নিয়ে কথা বলা। হোক সেটা ভালো কিংবা মন্দ কথা।

অফিসের কাজে আমাকে কয়েকবার বিভিন্ন আফগান মন্ত্রনালয়ে যেতে হয়েছে। নারী কলিগরা হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করেছে। যদিও এটা স্বাভাবিক চিত্র নয়, তারপরে বিভিন্ন সরকারি, কর্পোরেট অফিসে ব্যাপারটা নিয়মিত হয়ে উঠেছে। আমার রুমে একজন নারী কলিগ বসে। এখানে যারা সরকারী কাজ করে তাদের ছুটি হয় সাড়ে তিনটা বাজে। একবার অফিস ছুটির সময় হয়ে গেছে কিন্ত কোন একটা কাজে উনি আটকে গেছেন। উনার চোখে মুখে আতঙ্ক। খুব তাড়াহুড়া করে কাজ করার চেষ্টা করছেন এবং তাল গোল পাকিয়ে ফেলছেন। আমি বললাম তুমি ইচ্ছে করলে এখন চলে যেতে পারো।

আমি তোমার বসকে বলে দিবো, বাকি কাজ তুমি কাল এসে করো। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাচলো সে। বলল তার আজ সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। আফগান নারীরা অফিস এবং লেখাপড়া একসাথে ই করছে এটা বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। আমি যতগুলো আফগান নারী কলি্গ দেখেছি তারা অধিকাংশই বিদ্যালয়ে পড়ছে। এই প্রজন্মটা কেবল উঠে দাঁড়াচ্ছে। হয়তো আগামী কয়েক বছর পরে অনার্স বা মাস্টার্স করা নারী কলিগের অভাব হবেনা। শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই অপেক্ষা করছেন আফগান প্রেম-ভালোবাসার কথা কখন লিখবো! সময় এসে গেছে! একবার সাহস করে এক নারী কলিগকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমাদের এখানে প্রেম ভালোবাসার হাল হকিকত কেমন ? বলল, দেখো মাসুদ আমাদের পরিবারে কেউ না কেউ যুদ্ধে আহত কিংবা নিহত হয়েছে। আমরা অস্ত্র দেখে বড় হয়েছি।

সব কিছুই আফগান জালেবী গানের মত মধুর এবং সহজ নয়। বিয়ের আগে বা পরে কোন পর পুরুষের সাথে মেশা এমনকি কথা বলাও আমাদের পরিবার কোনভাবেই মেনে নেবে না। বিয়ের পরেও যে স্বামীর সাথে প্রেম হয় তা নয়। তাদের হুকুম ই আমাদের কাছে আদেশ। কথাটা অনেকটা সত্য বলে মনে হলো। অনেকটা বলছি এর কারন আছে, পরের অংশে বলছি। আমি নিজেও কোন আফগান ছেলেমেয়েকে একসাথে রাস্তায়, পার্কে বা শপিংমলে খুব একটা দেখিনি। বাংলাদেশে থাকতেই আফগান দুতাবাসে এক আফগান মেয়ের সাথে পরিচয় হয়। সে বাংলাদেশের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, বলল কাবুলে আমার কিছু ডকুমেন্ট পাঠাতে হবে তুমি নিয়ে যেতে পারবে?

আমি নিয়ে আসলাম। কয়েক মাস পরে সেও কাবুলে আসলো। একদিন সরাসরি সে আমার অফিসেই চলে আসলো। তার সাথে কথা বলে বুঝলাম সে গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড শব্দগুলোর সাথে বেশ ভালোই পরিচিত। প্রেম করাটা তার কাছে কোন রাখ-ঢাকের বিষয় নয়। তার মত অনেকেই যারা বাইরে থেকে লেখাপড়া করে আসছে তাদের কাছে ব্যাপারটা খুবই সাধারন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, প্রেমের ধারণা পরিবর্তন হচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর সমান অধিকার, এখানে বিষয়টা হাস্যকর। স্ত্রী মানেই বাচ্চা দিবে, বাচ্চা লালন পালন করবে, ঘর গোছাবে এটাই স্বাভাবিক। ২টা করে বিয়ে করা এখানে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।

তবে মজার বিষয় হলো, এখানে মেয়েদের যৌতুক দেয়া লাগে না, উল্টো ছেলেদের যৌতুক দিতে হয়।যৌতুকের পরিমান নির্ধারিত হয় মেয়ে দেখতে কত সুন্দর,সম্পত্তি কতটুকু আছে ইত্যাদির উপর। আমার লেখা পড়ে অনেকেই কনফিউসড হয়ে যেতে পারেন। ভাই, আপনি একবার নারী অগ্রগতি আবার আরেকবার অবনতির কথা বললেন। আসলে আমি দুটো দিকই দেখছি এবং সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তবে আশার কথা হলো দিনে দিনে অগ্রগতি বেশ হচ্ছে।

প্রাসঙ্গিক ছবি না থাকায় আফগান সৌন্দর্যের ছবি দিলাম।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin