অন্য রকম এক ঈদ

শেয়ার করুণ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

গত ১লা আগস্ট দেশ ব্যাপি উদযাপিত হয়ে গেল পবিত্র ঈদুল আযহা। অন্য যে কোনো বারের তুলনায় এবারের ঈদটা ছিল অনেকটা ভিন্ন। করোনা, স্বল্পসংখ্যক গরুরহাট, মানুষের অথনৈতিক সমস্যা,উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি সবমিলিয়ে এক ধরনের সংকটময়  পরিস্থিতিতে উদযাপিত হলো পবিত্র ঈদ।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও আক্রান্ত। চিকিৎসা ব্যবস্থার ভঙ্গুর অবস্থা, মানুষের অর্থনৈতিক মন্দাব্স্থা সব মিলিয়ে দেশের করোনা পরিস্থিতি অনেকটা  স্থিতিশীল। অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও এর প্রভাব পড়েছে জনজীবনে।সবচেয়ে বিরুপ প্রভাব পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে। চাকুরী হারিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের অবস্থা বড্ডই নাজুক। ছোট মাঝারি ব্যবসায়ীরা তাদের পুজি হারিয়ে আজ প্রায় নিঃস্ব ।

দিনমজুর আর স্বল্প আয়ের মানুষেরা আজ কর্ম হারিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামমুখী ।এই মানুষের সারি দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে।যুক্ত হচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারও। এক জরিপে দেখা গেছে গত তিন মাসে প্রায় ৮ লাখ প্রবাসী দেশে ফিরেছেন তাদের কর্ম হারিয়ে। দেশের মোট বেকারের পরিমান প্রায় ২৭ লাখ। করোনার কারনে এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরো প্রায় ৫ লাখ। এমতবস্থায় ঈদুল আযহার আনন্দ এসব পরিবারের কাছে অনেকটা ফিকে। ঈদের দিনও করোনার প্রকোপে আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে ২৮ টি প্রাণ।২৮ টি পরিবারে ঈদের কোনো আনন্দ ছিলনা এটা বলাই বাহুল্য। দেশের আর্থ-সামজিক প্রেক্ষাপটে করোনা আক্রান্ত পরিবারগুলোর ঈদ আনন্দ যে বিষাদময় ছিল সেটা সহজেই অনুমেয়।

করোনার প্রভাব সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে দৃশ্যমান হয়েছে কোরবানীর পশুর হাটগুলোতে। এবারের ঈদে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাট ছিল সীমিত। করোনা পরিস্থিতি মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় বিধি-নিষেধ আরোপ করে চলে পশু বেচাকেনা। অন্য যে কোন বারের তুলনায় এবারের হাটের চিত্র ছিল সম্পূর্ন ভিন্ন। হাটে বয়স্ক এবং শিশুদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবারের হাট ছিল প্রায় শিশুশূন্য। যা চিরায়ত ঈদের চিত্রের সাথে বড্ডই বেমানান। শিশুদের আনাগোনা, কোরবানীর পশু  নিয়ে দলবেধে এলাকায় ঘুরাঘুরি এবার দেশের কোথাও তেমনভাবে লক্ষ্য করা যায়নি। করোনার কারনে দেশের অন্যতম এই বৃহৎ উৎসবে দেখা গিয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। 

রমজানের ঈদের ন্যায় এবারো দেশের কোথাও খোলা ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়নি।সকাল সকাল পরিবারের বড়দের সাথে ছোট সদস্যদের ময়দানমুখী হবার চিত্র ছিলনা এবারের ঈদে।নামজ শেষে সবার সাথে কোলাকুলি, বাচ্চাদের কোলাহোল সবই ছিল অনুপস্থিত।এবারের ঈদে শিশুদের অনুপস্থিতি ঈদের আনন্দকে করেছে বর্নহীন।

দেশের উত্তরাঞ্চলের ভয়াবহ পরিস্থিতি এবারের সার্বজনীন উৎসবকে করেছে বিষাদময় এক উৎসবে।তিস্তা,যমুনাসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে উত্তরাঞ্চলের জনপদ পরিনত হয়েছে এক উন্মুক্ত জলাশয়ে। করোনার প্রকোপ, ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা আর বন্যা উত্তেরের জনপদের মানুষের জীবনকে করেছে দুর্বিষহ। বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাবারের সংকট তাদের জীবনে নিয়ে আসেনি ঈদের অনন্দ। যেখানে টিকে থাকার সংগ্রাম চলছে অবিরাম সেখানে ঈদটা যেন খুবই বিলাসী একটা উপলক্ষ্য মাত্র। বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে বন্যা সম্পর্কে যতটা ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বাস্তবের চিত্র ছিল আরো ভায়াবহ। অনেক পরিবার শুধু পানি আর শুকনো খাবার দিয়ে ঈদ উদযাপন  করেছে।পর্যাপ্ত ত্রান সরবরাহ থাকলেও নানা জটিলতায় তা ভুক্তভোগীদের দুয়ার পর্যন্ত পৌছে নি। বন্যার প্রভাব দেশের উত্তরাঞ্চলে পড়লেও করোনার প্রভাব পড়েছে দেশের সকল সেক্টরে।অন্য যে কোন বারের তুলনায় এবারের ঈদটা ছিল সাদা- মাটা। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এবারের ঈদ ছিল এক দুঃস্বপ্নের ন্যায় ।অর্থনৈতিক টানা পোড়েনে জর্জরিত পরিবারের কর্তার কাছে পরিবারের আবদারগুলো কেবলি দুঃখ বাড়িয়েছে। 

এবারের ঈদের অন্যতম একটি ভিন্নতা ছিল কোরবানীর চামড়ার ব্যবসা।বিগত বছরগুলোতে অব্যহতভাবে কাচা চামড়ার দরপতনের কারনে এবার ছিলনা চামড়া নিয়ে টানাটানি। ধর্মপ্রান মুসলমানরা এবার নির্বিঘ্নেই তাদের কোরবানীর চামড়া দান করতে পেরেছেন তাদের পছন্দসই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে।এতে স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে কোরবানীদাতা এবং চামড়া সংগ্রহকারী  স্বেচ্ছাসেবকদের মাঝে।

 সময়ের স্বল্পতায় আজ ইতি টানতে হচ্ছে।মানবজীবনের প্রতিটা পরতে পরতে র‍য়েছে ভিন্নতা, বৈচিত্র। কত হাসির পিছনে লুকিয়ে আছে চাপা কান্নার গল্প। আবার কোন এমদিন হাজির হবো ভিন্ন কোন আয়োজন নিয়ে ভিন্ন কোন গল্প নিয়ে।সবশেষে বলতে চাই এমন সংকটময় ঈদ যেন সৃষ্ঠিকর্তা আর কখনো না দেয়।একটি সার্বজনীন উৎসবমুখর, করোনামুক্ত ঈদের প্রত্যাশায় আজ এখানেই ইতি টানছি। 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin